পুরান ঢাকার কলতাবাজারে একটি ছাত্রী মেস থেকে র্যাবের পরিচয় দিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) এক নারী শিক্ষার্থীকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রক্টরিয়াল টিম এবং জকসু প্রতিনিধিদের দ্রুত হস্তক্ষেপে ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চাপ সৃষ্টি করলে র্যাব সদস্যরা শিক্ষার্থীকে না নিয়েই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী তার ছোট বোনের সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে র্যাবের পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণের চেষ্টার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।
ঘটনাটি ঘটে রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে কলতাবাজারের জনসন রোডের লবণের গুদাম গলির একটি ছাত্রী মেসে। ভুক্তভোগী মমতাজ আরা বর্ষা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী। সংবাদ সম্মেলনে মমতাজ আরা বর্ষা দাবি করেন, এই পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত এবং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ। তার অভিযোগ, তার ছোট বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে র্যাবের পরিচয় ব্যবহার করে তাকে অপহরণের চেষ্টা করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে মমতাজ আরা বর্ষা বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, “চলতি বছরের মে মাসে আমার ছোট বোনের সাথে সুমন মিয়ার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সেই বিচ্ছেদের পর থেকেই সুমন তাদের পরিবার এবং আমার বোনকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছিলেন।” তিনি আরও জানান, গত আগস্ট মাসে তারা দিনাজপুর জজকোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলার ফলে সুমন ক্ষিপ্ত হয়ে যান এবং এরপর থেকে ফোন ও মেসেজের মাধ্যমে তাদের হুমকি দিতে শুরু করেন। ভুক্তভোগীর দাবি, সুমন মিয়া দীর্ঘদিন ধরে র্যাবের আইটি সেকশনে কর্মরত ছিলেন এবং সেই প্রভাব ও পরিচয় ব্যবহার করেই তাকে অপহরণের এই নীল নকশা করা হয়েছে। মামলার প্রতিশোধ নিতেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
ঘটনার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে মমতাজ আরা বর্ষা বলেন, “খুব ভোরে সিভিল পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি আমাদের ফ্ল্যাটে এসে দরজায় নক করেন। অপরিচিত মানুষ হওয়ায় আমরা শুরুতে দরজা খুলিনি। পরবর্তীতে তারা নিজেদের র্যাবের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলেও কোনো পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড), মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখাতে পারেননি। আমরা বারবার আইনি কাগজ দেখাতে বললেও তারা তা অস্বীকার করেন এবং অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আমাদের সাথে কথা বলেন। কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই তারা আমাকে জোর করে তুলে নিতে চান এবং আমাদের বাসা তল্লাশি শুরু করেন। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, তল্লাশির সময় সেখানে কোনো নারী সদস্য ছিলেন না। পুরুষ সদস্যরা কীভাবে একটি মেয়েদের মেসে ঢুকে তল্লাশি করতে পারেন? এই পুরো ঘটনায় আমি মানসিকভাবে চরমভাবে ভেঙে পড়েছি এবং এখন আমার নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে শঙ্কিত।”
মেসের বাসিন্দা এবং বর্ষার রুমমেট মেঘলা আক্তার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জানান, ওই ব্যক্তিরা প্রথমে দাবি করেছিলেন যে তারা একটি মামলার আসামি ধরতে এসেছেন। একপর্যায়ে তারা মমতাজ আরা বর্ষাকে জোর করে র্যাবের একটি গাড়িতে তুলে নেন। মেঘলা আক্তার বলেন, “সকাল পৌনে ছয়টার দিকে সিভিল পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি এসে নিজেদের র্যাবের সদস্য বলে পরিচয় দেন। তাদের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত রূঢ় এবং আক্রমণাত্মক। তারা আমাদের সাথে খুব খারাপভাবে কথা বলছিলেন এবং বাসা তল্লাশি করতে চেয়েছিলেন। আমরা অনুরোধ করেছিলাম যে এটি মেয়েদের মেস, তাই কথা বলার সময় ন্যূনতম শিষ্টাচার বজায় রাখতে। কিন্তু তারা তা মানেননি।”
তিনি আরও জানান, ওই ব্যক্তিরা দরজার লক হাত ও পা দিয়ে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তারা দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেন। মেঘলা আরও দাবি করেন, পরবর্তীতে পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে র্যাবের পরিচয়ে আরও কয়েকজন ব্যক্তি আসেন এবং মোট চারটি গাড়ি সেখানে উপস্থিত হয়। একপর্যায়ে মমতাজ আরা বর্ষাকে গাড়িতে তোলা হয়। প্রথমে তারা ‘দুইজন সন্ত্রাসী’র কথা বললেও পরে হঠাৎ করে ৩০ লাখ টাকা চুরির একটি মামলার কথা বলে শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফোন পাওয়ার পরপরই তিনি সেখানে যান এবং সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বিষয়টি অবহিত করেন। এরপর পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পৌঁছালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তিনি বলেন, “র্যাবের পরিচয়ে আসা ব্যক্তিদের আচরণে প্রথমে সন্দেহ তৈরি হলেও পরে সেখানে প্রকৃত র্যাব সদস্যরা আসেন। শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত ওই শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির এই ঘটনার বিষয়ে বলেন, “খবর পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি একজন শিক্ষার্থীকে র্যাবের গাড়িতে তোলা হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলি এবং স্পষ্টভাবে জানাই যে, শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক। শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা থাকলে তা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। এই মুহূর্তে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে।”
একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. তারেক বিন আতিক জানান, সকালে একজন শিক্ষার্থী তাকে মেসে র্যাবের লোকজন আসার কথা জানালে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তিনি বলেন, “আমরা সেখানে গিয়ে দেখি শিক্ষার্থীকে গাড়িতে তোলা হয়েছে। আমরা তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানাই যে, শিক্ষার্থী এখান থেকে যেতে পারবেন না। কোনো অপরাধ থাকলে প্রক্টর অফিস এবং উপাচার্য মহোদয়কে জানিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অধ্যাপক তারেক আরও অভিযোগ করেন যে, ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিরা তাদের পরিচয় বা মোবাইল নম্বর দিতে রাজি হননি, যা অত্যন্ত রহস্যজনক। এই বিষয়টি সূত্রাপুর থানার পুলিশকেও জানানো হয়।
অন্যদিকে, সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার এই বিষয়ে জানান, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তার ভাষ্যমতে, যারা এসেছিলেন তারা র্যাবের সদস্য ছিলেন এবং একটি মামলার অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিলেন। তবে পরবর্তীতে জানা যায় যে, এটি মূলত একটি পারিবারিক বিরোধজনিত মামলা। যার ফলে র্যাব সদস্যরা শিক্ষার্থীকে না নিয়েই চলে যান। মামলার বিস্তারিত তথ্যের জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। তবে বিস্তারিত জানতে চাইলে ওসি আনোয়ার ব্যস্ততার কথা বলে দ্রুত ফোনটি কেটে দেন।
জানা গেছে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, তার বোনের সাবেক স্বামীর সাথে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টিই এই ঘটনার মূল কারণ হতে পারে। যদিও অভিযুক্ত পক্ষের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পর ওই শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে রাখা হয়েছে। এই ঘটনার পর মেসের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।



















