ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এই তদন্তের শুনানির দিন বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের উপজেলা শিক্ষা অফিসে উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পাঠদান চলাকালীন সময়ে শিক্ষকদের কর্মস্থল ছেড়ে অফিসে আসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ ও বিস্ময় দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রেরিত নোটিশ অনুযায়ী, ফজিলাতুন নেছার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, বদলি বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে বুধবার সকালে যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান এবং প্রশাসনিক কাজ পুরোদমে চলার কথা, ঠিক সেই সময়েই উপজেলা শিক্ষা অফিসে বেশ কিছু প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষককে অবস্থান করতে দেখা যায়। এর ফলে বড় প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও তাঁরা কেন কর্মস্থল ত্যাগ করে এখানে এসেছেন? অফিসে আসা এক প্রধান শিক্ষককে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়ে বলেন, ‘এমনিতেই আসছি। ম্যাডামের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়ার কথা, তাই দেখতে আসছি।’ অন্যদিকে, রাজাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসমা আক্তার জানান, ‘ম্যাডাম আমাকে আসতে বলেছেন, তাই এসেছি। এর বাইরে আর কিছু জানি না।’

শিক্ষকদের এই উপস্থিতির বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মুজিব আহমেদ জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং তদন্ত সংশ্লিষ্টদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। তবে সব শিক্ষক কেন বা কীভাবে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত জানা নেই। যদিও সরকারি প্রয়োজনে বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রধান শিক্ষকদের শিক্ষা অফিসে আসা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবে স্কুল চলাকালীন সময়ে যথাযথ অনুমতি নিয়ে তাঁরা এসেছেন কি না, তা নিয়ে সংशय দেখা দিয়েছে।

এদিকে নান্দাইল উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের এক বড় সংকট হলো প্রধান শিক্ষকের অভাব। উপজেলার মোট ১৭৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০৮টি বিদ্যালয়েই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে ৪৬টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। এমন চরম সংকটের সময়ে বিদ্যালয়ের পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তাই শিক্ষকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা।

তদন্তের প্রয়োজনে কাউকে ডাকা হলে তার কারণ ও দায়িত্ব স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে ফজিলাতুন নেছার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তাধীন রয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন আসার পর সবকিছুর সত্যতা স্পষ্ট হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তদন্ত প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার পাশাপাশি যেন বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেদিকে কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।