“পুলিশ বলে, তুই বাচ্চা হারাইছিস তো আমি কী করব?”— এই বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে সংবাদ সম্মেলনের পরিবেশ। ঝিনাইদহের খাজুরা গ্রামের কাপড় বিক্রেতা হোশেন আলী যখন তার ১২ বছর বয়সী ছেলে মো. আলীর নিখোঁজ হওয়ার কথা বলছিলেন, তখন তার অসহায়ত্বের করুণ চিত্র উপস্থিত সবার চোখে জল এনে দেয়। দেড় মাস ধরে নিখোঁজ তার সন্তান। অভিযোগ, সন্তানকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতি নিয়ে নিকটস্থ থানায় অভিযোগ জানাতে গেলেও পুলিশ তাকে তিন দিন ধরে ঘুরিয়েছে, কিন্তু কোনো কার্যকর সহায়তা মেলেনি।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘জিরো মিসিং চিল্ড্রেন’ আয়োজিত ‘আমার সন্তান কোথায়?’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এমন বহু হৃদয়বিদারক কাহিনী উঠে এসেছে। নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত সন্ধান, তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং এই বিষয়ে রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ৪০টি নিখোঁজ শিশুর পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। তাদের চোখে-মুখে ছিল কেবল এক অনিশ্চিত অপেক্ষা আর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতি।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে শিশু নিখোঁজ সংক্রান্ত মোট ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, ২ হাজার ৩৮ জন শিশু এখনও নিখোঁজ রয়ে গেছে। এই বিপুল সংখ্যক শিশুর নিখোঁজ হওয়া এবং তাদের উদ্ধার না হওয়া বিষয়টি অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে সাভারের বলিয়ারপুর থেকে নিখোঁজ চার বছর বয়সী শিশু যাদব কর্মকারের মা বাসনা কর্মকার তার করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি অভিযোগ করেন, ফোনে হুমকি পাওয়ার পর সন্দেহভাজনদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পুলিশকে দেওয়া হলেও তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। একইভাবে কামরাঙ্গীরচর থেকে ১১৫ দিন ধরে নিখোঁজ তিন বছর বয়সী শিশু সামিয়ার পরিবার জানায়, টিকটকে শিশুটিকে ‘মিঠাই’ নামে দেখা যাওয়ার বিষয়টি পুলিশকে জানানো সত্ত্বেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মামলাটি ডিবি এবং পরবর্তীতে পিবিআইতে গড়ালেও আজও মেলেনি সন্তানের সন্ধান।

এই বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, বর্তমানে অনলাইনে জিডি করার ব্যবস্থা রয়েছে এবং কোনো জিডি যদি প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকে, তবে তা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু হিসেবে গণ্য হয়, ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রেম বা অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও নিখোঁজ জিডির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে পুলিশের অন্যান্য দায়িত্বের পাশাপাশি শিশু নিখোঁজের বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে দেখা হয় বলে দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

সংবাদ সম্মেলনের পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের দাবিদাওয়া সম্বলিত একটি স্মারকলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তাদের মূল দাবি— নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত রহস্যময় নিখোঁজ ঘটনাগুলোর পুনঃতদন্ত এবং শিশু নিখোঁজ ও পাচার রোধে কঠোর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।