কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের নওয়ানি পাড়া এলাকার বাসিন্দা নাইমুল ইসলাম। পেশায় তিনি গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক। তবে শিক্ষকতার মতো একটি মহান পেশার আড়ালে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সীমান্তপথে অবৈধ পণ্য প্রবেশের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায়ের সঙ্গে জড়িত বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অসামাজিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নারায়ণপুর, পাখি উড়া এবং দইখাওয়াসহ বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ভারত থেকে যেসব অবৈধ পণ্য কুড়িগ্রামে প্রবেশ করে, সেসব চালানের পেছনে নাইমুল ইসলামের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি পণ্যের চালানের জন্য তাকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। আর যদি কোনো চালানের ক্ষেত্রে তাকে টাকা দেওয়া না হয়, তবে সেই চালানটি বিজিবির হাতে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে অবৈধ অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে তিনি এলাকায় বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।

তদন্ত ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, একসময় আর্থিকভাবে অত্যন্ত অস্বচ্ছল একটি পরিবার থেকে উঠে আসা নাইমুল ইসলাম এখন এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী ও বিপুল সম্পদের মালিক। অবৈধভাবে অর্জিত এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বৈধ করার উদ্দেশ্যে তিনি শেয়ার বাজারে বা স্টক ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। এছাড়া যাত্রাপুর হাটে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব 'মাস্টার সুপার মার্কেট'। শুধু তাই নয়, ওই হাটে আরও অসংখ্য দোকানপাট রয়েছে তার নিজের নামে এবং বেনামে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করলেও বেতনভুক্ত হয়েছেন মাত্র এক বছর আগে। গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের এক সহকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নাইমুল ইসলাম ২০০৫ সালে ওই বিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং ২০২৫ সালে এমপিওভুক্ত হন। বর্তমানে তার মাসিক বেতন মাত্র ১৬ হাজার টাকা। ওই শিক্ষকের দাবি, সরকারি এই সামান্য বেতনের আয়ের সাথে নাইমুল ইসলামের কোটি কোটি টাকার সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। তার এই বিপুল বিনিয়োগ এবং সম্পদের উৎস সম্পূর্ণ অবৈধ বলে তিনি মনে করেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই অবৈধ কারবারে তাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছেন তার জামাতা আপল এবং শ্যালক বিপ্লব। তবে এই সব অভিযোগের বিষয়ে নাইমুল ইসলাম স্বীকার করেছেন যে তিনি অর্থ আদায় করেন। তবে তিনি দাবি করেন, আদায় করা অর্থের অধিকাংশ যায় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পকেটে, তিনি কেবল সামান্য কিছু কমিশন পান। তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি এই ধরনের কর্মকাণ্ড বৈধ কি না, সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি এবং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

এই বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিসার শরিফুল ইসলাম জানান, কোনো শিক্ষক যদি এমন অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকেন, তবে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, কুড়িগ্রাম দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ পরিচালক মো. আতিক জানান, অবৈধ সম্পদের বিষয়ে কমিশনের কাছে অভিযোগ আসলে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হবে।