সরকার গঠনের পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক মানুষ এখন খোলাখুলিভাবে বলছেন যে, তারা আর কখনো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে ভোট দেবেন না। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মতিঝিলে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লং মার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে এক কঠোর ও আবেগঘন বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে অলি আহমদ তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আমার ৮৮ বছর বয়সে আমি এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি, যেখানে একটি সরকার গঠন হওয়ার পরপরই সাধারণ মানুষ বলতে শুরু করে যে এই সরকার টিকবে না। মানুষ সাধারণত কখন এমন কথা বলে? আমি সারাক্ষণ দেখছি নারীরা, পুরুষেরা ক্ষোভে নিজের জুতা নিজের কপালে মারছে এবং চিৎকার করে বলছে—আর কখনও বিএনপিকে ভোট দেব না।’

লং মার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়ে এলডিপির সভাপতি বলেন, ‘আপনারা এত ভোরে এখানে একত্রিত হয়ে আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। আমি আমার এলডিপির পক্ষ থেকে এবং ১১ দলের পক্ষ থেকে আপনাদের সকলকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাচ্ছি। আপনারা যেভাবে এত সকালে এই বিশাল জনসভার আয়োজন করেছেন, তা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অন্য কোনো দলের পক্ষে সম্ভব নয়।’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে তিনি কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, তারেক রহমান চাইলে বিএনপির নেতাকর্মীদের ভোরে ঘুম থেকে ওঠার সক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। কারণ তার মতে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ইবাদত করেন এবং অনেক দেরিতে ঘুমান, ফলে ভোরে জেগে ওঠা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অতীতের একটি বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়ে অলি আহমদ প্রশ্ন তোলেন, ‘ফখরুল সাহেব এই বিল্ডিংয়ের ঠিক পেছনেই রয়েছেন। একসময় তিনি বলেছিলেন—গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছাড়। এখন পরিস্থিতি বদলেছে, এখন ফখরুল সাহেব কী বলবেন তা দেখার অপেক্ষায় আছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রসঙ্গ টেনে অলি আহমদ বলেন, ‘সালাহউদ্দিন সাহেব যিনি বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বেগম জিয়ার অনুরোধে আমি তাকে তার নিজের এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি তার ব্যক্তিগত বিষয়ে বিশেষ কিছু বলতে চাই না, তবে সবাই তাকে এখন ‘শিলং সালাহউদ্দিন’ নামে একটি নতুন উপাধিতে ভূষিত করেছে। তিনি একসময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন যে, কোরআন এবং সুন্নাহর বাইরে তিনি কোনো কাজ করবেন না। এখন আমি উনার কাছে জানতে চাই, তিনি কি এখনো সেই আদর্শের জায়গায় আছেন? যদি থেকে থাকেন, তবে আমাদের সঙ্গে সমস্যাটা কোথায়?’

দেশ পরিচালনায় সৎ, দেশপ্রেমিক এবং ঈমানদার ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়ে অলি আহমদ বলেন, ‘দেশকে সঠিকভাবে চালানোর জন্য প্রকৃত ঈমানদার লোকদের বেছে নিতে হবে। বেইমান, মুনাফেক এবং বিদেশি দালালদের দিয়ে এই দেশ কখনোই চলবে না।’

১১ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি এবং আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজকে আমরা কেন এখানে একত্রিত হয়েছি? আমরা বিভিন্ন সভায় স্পষ্ট করে বলেছি, যদি জনগণের ন্যায্য দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া না হয়, তবে ১১ দলের পক্ষ থেকে সরকারকে বাধ্য করা হবে। তবে এই প্রক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক। আমরা আমাদের আন্দোলনের প্রথম রাউন্ড শেষ করেছি এবং এখন দ্বিতীয় রাউন্ড শুরু করছি। যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা এখনো বসে আছেন; আমি তাদের সঠিক পথে চলার আহ্বান জানাই। অন্যথায়, অতীতে যারা দেশ ছেড়ে পলায়ন করেছেন, তাদের পথ অনুসরণ করতে হবে আপনাদেরও।’

লং মার্চকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ যারা আমাদের সাথে এই লং মার্চে শামিল হয়েছেন, তাদের সবাইকে অনুরোধ করব অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সামনে এগিয়ে যেতে। কারণ আমরা কোনো সন্ত্রাসী দল নই। আমরা রিজওয়ানার দল নই। রিজওয়ানার দল বলতে কী বোঝাচ্ছি, তা আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আমরা সত্যিকার অর্থে মুসলমানদের দল। আমরা সবাই কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে চলি, আল্লাহর আইন এবং সুশাসনের কথা বলি।’

তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, লং মার্চের পথে কেউ বাধা সৃষ্টি করলে তা অত্যন্ত শক্তভাবে মোকাবিলা করা হবে। অলি আহমদ বলেন, ‘আমাদের মিছিল হবে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল। কিন্তু আমাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর পথে যদি কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাকে অধিকতর শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা হবে।’

সবশেষে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘কেউ যদি মনে করেন আমরা এখানে মেজবান খেতে এসেছি, তবে তা ভুল ধারণা। আমরা এখানে মেজবান খেতে আসিনি। আমরা এসেছি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এবং ইনশাআল্লাহ, আমার নবীর দয়ায় আমরা সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারব।’