যশোর শহরের রাজপথ থেকে শুরু করে অলিগলিতে এখন এক আতঙ্কের নাম 'কিশোর গ্যাং'। র্যাব ও পুলিশ প্রশাসনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে যশোর শহর এবং এর আশপাশের এলাকায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি কিশোর গ্যাং অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। এই গ্যাংগুলোর প্রতিটি গ্রুপে সদস্য সংখ্যা গড়ে ৮ থেকে ১৬ জনের মধ্যে হয়ে থাকে, যাদের বয়স সাধারণত ১৪ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। শহরের পালবাড়ি, ধর্মতলা, শংকরপুর, বেজপাড়া, রায়পাড়া তুলোতলা, ষষ্টিতলা, খড়কি, রেলগেট, চাঁচড়া, বারান্দিপাড়া, মণিহার, নীলগঞ্জ, বকচর এবং উপশহরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে এদের অপতৎপরতা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া শহরতলির মুড়লী খাঁপাড়া, হামিদপুর, শেখহাটি এবং পুলেরহাট এলাকায়ও এই কিশোর গ্যাংগুলোর দাপট চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের এই ভয়াবহ রূপটি একদিনে গড়ে ওঠেনি। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে বর্তমানের এই চরম আকার ধারণ করেছে। যশোরে অনেক আগে থেকেই এলাকাভিত্তিক কিছু ‘বড় ভাই’ বা রাজনৈতিক ক্যাডারদের ছোট ছোট অনুসারী দলের অস্তিত্ব ছিল। তবে ২০১২ সালের পর থেকে স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা ও ব্যাপক ব্যবহারের ফলে কিশোররা নিজেদের ছোট ছোট গ্রুপে সংগঠিত হতে শুরু করে। শুরুর দিকে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেওয়া, পথচারী মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা এবং তুচ্ছ বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করা। তবে ২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে আদনান কবির হত্যাকাণ্ডের পর যখন ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দটির ব্যাপক পরিচিতি পায়, তখন যশোরের কিশোররাও এই গ্যাং কালচারে প্রবলভাবে উৎসাহিত হয়।
সময়ের সাথে সাথে এই কিশোর গ্যাংগুলো আর ছোটখাটো ঝগড়া বা ইভটিজিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা এখন জড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত ভয়াবহ সব অপরাধে। প্রশাসনসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। জানা গেছে, যশোরে ২০২৩ সালে অর্ধ শতাধিক, ২০২৪ সালে একশরও বেশি, ২০২৫ সালে ৬০টি এবং ২০২৬ সালের প্রথম ৫ মাসে ২০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রেস ব্রিফিং ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিশোর গ্যাংয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনেও এই কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসীদের হাত রয়েছে বলে তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এই কিশোর গ্যাংগুলোর উত্থানের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। শহরের এমএম আলী রোডে বাবার রেখে যাওয়া ‘জামান ফার্মেসি’ নামক ওষুধের দোকানটি পরিচালনার পাশাপাশি ২০০৩ সালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন শাহীন চাকলাদার। ওই বছরই তিনি জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান এবং পাশাপাশি ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। দ্রুত রাজনৈতিক সিঁড়ি বেয়ে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের পরবর্তী কমিটির সাধারণ সম্পাদকের পদটি লাভ করেন, যা অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়কর। ঠিকাদারি ব্যবসা এবং রাজনীতি—উভয় অঙ্গনে নিজের আধিপত্য পাকাপোক্ত করতে তিনি পেশিশক্তির আশ্রয় নেন এবং নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী লালন-পালন করতে শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর শাহীন চাকলাদারের ব্যাপক প্রভাব ছিল। কোনো অপরাধী ধরা পড়লে তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের মুক্ত করে আনতেন। এই ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ কিশোরদের আরও বেপরোয়া করে তোলে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার পাশাপাশি অনেক কিশোরকে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়।
অন্যদিকে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে যশোর-৩ (সদর) আসন থেকে ব্যবসায়ী কাজী নাবিল আহমেদ এমপি নির্বাচিত হয়ে সবাইকে অবাক করে দেন। ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এমপি পদে আসীন ছিলেন। সময়ের সাথে সাথে তিনি হয়ে ওঠেন শাহীন চাকলাদারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। ঠিকাদারি ব্যবসা এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াইয়ে শাহীন চাকলাদার যখন পুরোপুরি সন্ত্রাস নির্ভর হয়ে পড়লেন, তখন কাজী নাবিল আহমেদও পিছিয়ে থাকেনি। রাজনৈতিক লড়াইয়ে টিকে থাকতে তিনি গড়ে তোলেন পাল্টা সন্ত্রাসী বাহিনী, যার একটি বড় অংশই ছিল কিশোর।
২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ও তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুর পর সেখানে উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন শাহীন চাকলাদার। স্থানীয়দের দাবি, এই দুই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের লালিত-পালিত সন্ত্রাসীরা নিজেদের দলের শক্তি প্রদর্শনের জন্য কিশোরদের দলে টানা শুরু করে। বিশেষ করে ২০১৭-২০১৮ সালের দিকে এই কিশোর সন্ত্রাসীরা চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মূলত শাহীন চাকলাদার ও কাজী নাবিলের এই সন্ত্রাস নির্ভর রাজনীতির ফসল হিসেবেই আজকের এই কিশোর গ্যাংয়ের জন্ম, যা বর্তমানে যশোরবাসীর জান-মাল এবং মান-সম্মানের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যশোরের সচেতন মহলের অভিমত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে ওই দুই বিতর্কিত এমপিসহ জেলা আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতা এবং তাদের সহযোগীরা গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কিশোর গ্যাংগুলোর ‘বড় ভাই’ শূন্য হয়ে গেছে। বরং শুধু ‘বড় ভাই’র পরিবর্তন হয়েছে। রাজনীতিবিদরা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য এই কিশোর গ্যাং সদস্যদের ব্যবহার করে আসছেন এবং বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সুরক্ষা প্রদান করছেন। এই প্রশ্রয়ের কারণেই তারা প্রশাসনকে ভয় পায় না। বিভিন্ন সময় ঝুঁকি নিয়ে প্রশাসন তাদের আটক করলেও, প্রভাবশালী মহলের চাপে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে এবং পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়।
যশোর জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহামুদ হাসান বুলু এশিয়া পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “কিশোর গ্যাং এখন যশোরবাসীকে চরম উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। প্রায় প্রতিটি পাড়ায় একটি করে গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় লালিত-পালিত হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ করে, ফলে তারা নিজেদের অপ্রতিরোধ্য মনে করে। দ্রুত এদের নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ না নেওয়া হলে আমরা যশোরবাসী আর শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারব না।”
অন্যদিকে, খুলনা রেঞ্জের উপ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোস্তাফিজুর রহমান এক মতবিনিময় সভায় জানান, কিশোর গ্যাং দমনে খুলনা বিভাগের প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত অভিযান এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, কিশোর গ্যাং সমাজের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
যশোর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মিরাজুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে জানান, কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে শুধু রাজনীতি নয়, বরং পরিবার, সামাজিক পরিবেশ এবং মাদকের প্রভাবও রয়েছে। তাই কেবল আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়; পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের নামে কেউ সন্ত্রাস, মাদক, ছিনতাই বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যশোর জেলাকে কিশোর গ্যাংমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, অতীতে অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিচালিত হলেও বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো হস্তক্ষেপ নেই। এই রাজনৈতিক প্রভাবের অনুপস্থিতি প্রশাসনের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করছে।
















