বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক নারীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন, পরবর্তীতে একত্রে বসবাস এবং বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পরও স্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদা ও অধিকার প্রদানে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে শাস্তির মুখে পড়লেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসিপি) খান মাহমুদুল হাসান। তার এই কর্মকাণ্ডকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে দুই বছরের জন্য বেতনবৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদণ্ড প্রদান করেছে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর আওতায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে গত ৫ সেপ্টেম্বর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই শাস্তির কথা জানানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রমাণিত অভিযোগের গুরুত্ব এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়াদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে খান মাহমুদুল হাসানকে ‘০২ (দুই) বছরের জন্য বেতনবৃদ্ধি স্থগিত’ সূচক লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদেশে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, এই দণ্ডকালীন সময়ে তিনি কোনো বকেয়া প্রাপ্য হবেন না এবং এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালে জাকিয়া পারভীন নামে এক নারীর সঙ্গে খান মাহমুদুল হাসানের পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০২১ সালে মাহমুদুল হাসান সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে চাকরিতে যোগদানের পরও তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। অভিযোগ করা হয়, বিয়ের প্রলোভন ও আশ্বাসে ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জাকিয়া পারভীন ঢাকায় এসে একটি মেসে মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাহমুদুল হাসান ঢাকার বাইরে কর্মরত থাকলেও ছুটিতে ঢাকায় এসে বিভিন্ন হোটেলে ওই নারীর সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো অবস্থান করতেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে তারা রাজধানীর চকবাজার এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেন এবং সেখানে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে একত্রে বসবাস শুরু করেন। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও বিয়ের ব্যাপারে গড়িমসি করায় ক্ষুব্ধ হয়ে জাকিয়া পারভীন ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই চকবাজার থানায় মামলা করার উদ্যোগ নেন। ঠিক সেই দিনেই চাপের মুখে মাহমুদুল হাসান তাকে বিয়ে করেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও তিনি স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করেননি এবং স্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করেননি। পরবর্তীতে পারস্পরিক বনিবনা না হওয়া, প্রতারণা এবং মাহমুদুল হাসানের আগের বিয়ে ও সন্তানের কথা গোপন রাখার অভিযোগ তুলে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর তাকে তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়।
বিভাগীয় মামলার তদন্তে দেখা গেছে, জাকিয়া পারভীন বিবাহিতা হওয়া সত্ত্বেও তার সঙ্গে বিভিন্ন হোটেল ও ভাড়া বাসায় স্বামী-স্ত্রীর মতো অবস্থান করা এবং পরবর্তীতে রেজিস্ট্রির মাধ্যমে বিয়ে করেও স্ত্রীর মর্যাদা না দেওয়া একজন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তার জন্য অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কর্তৃপক্ষ একে শৃঙ্খলা পরিপন্থী, নৈতিক স্খলন এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। এই কারণে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
বিভাগীয় প্রক্রিয়ার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৮ জুন তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে অভিযোগনামা ও বিবরণী প্রদান করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তা ২২ জুলাই তার জবাব দাখিল করেন এবং ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন জানান। সেই প্রেক্ষিতে গত ২ সেপ্টেম্বর তার ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে অভিযুক্ত ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য, অভিযোগের জবাব এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষ তাকে লঘুদণ্ড দেওয়া সমীচীন বলে মনে করে।
তবে সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত বিষয়গুলোর বাইরেও ভুক্তভোগী নারীর করা মামলায় আরও গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হওয়ার পর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে ২০২৩ সালে জাকিয়া পারভীন নিজ জেলা থেকে ঢাকায় এসে মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভুক্তভোগীর দাবি, ২০২৫ সালের ২ মার্চ বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে মাহমুদুল তাকে কক্সবাজার নিয়ে যান এবং সেখানে একটি হোটেলে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ১ এপ্রিল ২০২৫ সালে রাজধানীর চকবাজারের হরনাথ ঘোষ রোডে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিলেও তিন মাস পর বিয়ের জন্য চাপ দিলে মাহমুদুল বিষয়টি এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। ১ জুলাই বিয়ের কথা পুনরায় বললে তাকে ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে ওই নারী দাবি করেন। পরবর্তীতে ২৪ জুলাই চকবাজার থানায় মামলা করতে গেলে মধ্যস্থতার পর ২৭ জুলাই একটি কাজি অফিসে তাকে বিয়ে করেন মাহমুদুল হাসান। তবে ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরপরই মাহমুদুল তাকে কাজি অফিসেই রেখে চলে যান।
ওই নারীর দাবি, পরবর্তীতে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও মাহমুদুল নানা অজুহাত দেখাতেন এবং একপর্যায়ে জানান যে, ধর্ষণ মামলা এবং সরকারি চাকরি থেকে বাঁচতেই তিনি বিয়ের ‘নাটক’ করেছেন, প্রকৃতপক্ষে তার সঙ্গে কোনোদিন সংসার করবেন না। একই সঙ্গে তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। নিজের নিরাপত্তা এবং প্রতিকার চেয়ে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট তিনি ডিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানান। সেখান থেকে কোনো সুরাহা না পেয়ে পরবর্তীতে তিনি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলা দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী নারী গণমাধ্যমকে জানান, বিয়ের আশ্বাসে দিনের পর দিন তাকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে এবং মামলা ঠেকানোর জন্য তাকে বিয়ে করে মাহমুদুল পালিয়ে গেছেন। বর্তমানে তার মোবাইল নম্বর ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও তাকে ব্লক করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে খান মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তার আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ইমরান হোসেন পাল্টা অভিযোগ তুলে দাবি করেন, অভিযোগকারী নারী এর আগেও একাধিক স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এবং নিজের আগের বিয়ের কথা গোপন রেখে মাহমুদুল হাসানকে বিয়ে করেছিলেন। আইনজীবীর দাবি অনুযায়ী, এই ঘটনায় খান মাহমুদুল হাসান ঢাকার সিএমএম আদালতে ওই নারীর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেছেন।
উল্লেখ্য যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে যে বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়েছে, তার ভিত্তিতেই মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে। তবে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগটি পৃথক বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। ফলে বিভাগীয় শাস্তির এই আদেশকে ধর্ষণের অভিযোগে আদালতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। এখন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।















