পারিবারিক দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে, রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার ভরার উদ্দেশ্যে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন সালিম আল-আশকার। কিন্তু সেই সাধারণ যাত্রাটিই হয়ে দাঁড়ালো তার জীবনের শেষ যাত্রা। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে হাসপাতালের মর্গে পৌঁছালেন গাজার এই প্রতিভাবান ফিলিস্তিনি গোলরক্ষক। ইসরায়েলি ট্যাঙ্কের ভয়াবহ গোলাবর্ষণের শিকার হয়ে প্রাণ হারালেন তিনি। চলমান এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ফিলিস্তিনি ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে এটি আরও একটি মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হলো।
ঘটনাটি ঘটে বুধবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত আল-কারারা এলাকায়। স্থানীয় ক্লাব 'খাদামাত খান ইউনিস'-এর নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক আল-আশকার যখন তার সাইকেল নিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই ওই এলাকায় অবস্থান নেওয়া একটি ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক থেকে হঠাৎ ভারী গোলাবর্ষণ শুরু হয়। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি গোলা সরাসরি তার পেটে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের পাশাপাশি তার পাকস্থলী, অন্ত্র, যকৃত এবং অগ্ন্যাশয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের যুদ্ধের করাল গ্রাসে গাজার সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকটের মুখে চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তার অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে লড়াই করে প্রায় দুই ঘণ্টা পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৩২ বছর বয়সী আল-আশকার।
খাদামাত খান ইউনিসের পাশাপাশি আল-আকসা এবং আল-মাসদার ক্লাবের হয়েও মাঠ কাঁপিয়েছেন এই দক্ষ গোলরক্ষক। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুখী। মাত্র পাঁচ মাস আগে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। এখন তার স্ত্রী তাদের প্রথম সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। পরিবারের একমাত্র ছেলে আল-আশকার তার পেছনে রেখে গেছেন সাত বোনকে, যাদের একমাত্র ভরসা ও আশ্রয় ছিলেন তিনি।
তার এই আকস্মিক মৃত্যুর খবরে ফিলিস্তিনসহ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ফিলিস্তিনি অভিবাসীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত চিলির ক্লাব 'ডেপোর্তিভো প্যালেস্তিনো' এক শোকবার্তায় জানিয়েছে, "খাদামাত খান ইউনিসের গোলরক্ষক সালিম আল-আশকারের অকাল মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে তার প্রাণহানির এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। গাজায় এমন নৃশংসতা বারবার ঘটছে, আমরা এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।"
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ১,০ ০৯ জন ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ প্রাণ হারিয়েছেন। এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে অন্তত ৫৬৭ জনই ছিলেন ফুটবলার। নিহতদের তালিকায় ছিলেন সুপরিচিত ফুটবলার সুলেইমান আল-ওবেইদও, যিনি গত বছরের আগস্টে মানবিক সহায়তা সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। ফিলিস্তিনের ফুটবল অঙ্গন দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধের এই নির্মম বাস্তবতার শিকার। শুধু খেলোয়াড়রাই নন, বারবার হামলার মুখে পড়েছে বিভিন্ন ক্লাব, স্টেডিয়াম, অনুশীলন মাঠ এবং অন্যান্য ক্রীড়া অবকাঠামো। গাজার ক্রীড়াজগতের এক বিশাল অংশ এখন কেবল ধ্বংসস্তূপের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।











