বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে অবস্থিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত এক মাস ধরে কয়লার স্বল্পতার কারণে এই কেন্দ্রটির উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্ণ শক্তিতে উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এর ফলে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পরছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দিবাগত রাত ১২টার দিকে হঠাৎ এক কারিগরি ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এবং লোডশেডিংয়ের মাত্রা আবারও বেড়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির সূত্রমতে, গত ৭ আগস্ট থেকে ঝোড়ো আবহাওয়ার কারণে কয়লা সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, ফলে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পায়। তবে গত মাসের শেষ দিকে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলে দিনের বেলা উৎপাদন ৯০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এই সরবরাহ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছেছিল এবং মধ্যরাতের আগে তা ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু একটি ইউনিট অচল হয়ে পড়ার পর বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতা কমে ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে।
ঝাড়খন্ডের এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। ২০১৭ সালে পিডিবি-র সাথে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে এই কেন্দ্রটি চালু হয়। এখানে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। এর আগে চাহিদার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রটি ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে রেকর্ড গড়েছিল। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির বয়লারে গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে। বয়লারটি সম্পূর্ণ শীতল হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন, এরপরই কেবল মেরামতের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। ফলে উৎপাদন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
এদিকে, আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই বিপর্যয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ বর্তমানে এক গভীর জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশে তীব্র গ্যাসের সংকট চলছে, যার ফলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। পটুয়াখলীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে এবং অন্য ইউনিটটিতে কয়লার স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। একইসাথে বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও কয়লার সংকটে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।
এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের বিদ্যুৎ সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পিডিবি সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা যথেষ্ট হচ্ছে না। বিশেষ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় লোডশেডিংয়ের প্রকোপ আরও বাড়ছে। গত বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় লোডশেডিংয়ের সর্বোচ্চ পর্যায় দেখা যায়, যেখানে ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল। এমনকি শুক্রবার ছুটির দিনেও সারা দেশে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

















