বড় বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট কিংবা গেমসগুলোর সময় ক্রীড়া কর্মকর্তাদের ‘কোচ’ হিসেবে পাঠানোর সংস্কৃতি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিনের। তবে এই বিতর্কিত প্রথা এবং কর্মকর্তাদের কোচ বনে যাওয়ার প্রবণতার বিষয়ে এবার কঠোর নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল হক। তার এই অবস্থানের বিপরীতেও আসন্ন জাপান এশিয়ান গেমসের তালিকায় কর্মকর্তাদের কোচ হিসেবে পাঠানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন হকি ফেডারেশনের কোষাধ্যক্ষ এবং সাবেক জাতীয় ফুটবলার মিজানুর রহমান ডন। আসন্ন জাপান এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণের জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সরকারি আদেশের জন্য যে তালিকা পাঠানো হয়েছে, সেখানে পুরুষ হকি দলের কোচ হিসেবে ডনের নাম দেখা গেছে। একজন ফুটবলার এবং ফেডারেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তার নাম হকি দলের কোচ হিসেবে তালিকায় আসায় ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

এই বিষয়ে হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইসতিয়াক সাদেক রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ‘তার নাম সহকারী ম্যানেজার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, তিনি আমাদের কোচ নন।’ খোদ মিজানুর রহমান ডন নিজেও এই বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি একজন ফুটবলার এবং আমার কিছু সাংগঠনিক দক্ষতা রয়েছে, কিন্তু আমি হকির কোচিংয়ের বিষয়ে কিছুই বুঝি না। এমতাবস্থায় আমি কেন কোচ হব?’

পুরুষ হকি দলে বর্তমানে টিম লিডার হিসেবে রয়েছেন যুগ্ম সম্পাদক আরিফুল হক প্রিন্স এবং সাজেদ এএ আদেল। ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক জাতীয় খেলোয়াড় প্রিন্স এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘স্বাগতিক জাপান এবং আয়োজক কমিটি এবার টিম ম্যানেজার পদটি রাখেনি। তাই ফেডারেশন থেকে ম্যানেজার হিসেবে চিঠি দেওয়া হলেও অলিম্পিক গেমসের ফরম্যাট অনুযায়ী একে টিম লিডার করা হয়েছে। শুধু হকি নয়, ফুটবল, ক্রিকেটসহ সকল খেলায় একই ফরম্যাট অনুসরণ করা হচ্ছে। ডন ভাইয়ের নাম ফেডারেশন থেকে সহকারী ম্যানেজার হিসেবেই প্রস্তাব করা হয়েছিল।’

তবে সহকারী ম্যানেজারের পদটি ফরম্যাট পরিবর্তনের কারণে কোচ হয়ে গেল কি না, সেই বিষয়ে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। সরকারি আদেশের তালিকায় এমন ভুল থাকা অত্যন্ত অনুচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক জাহেদ পারভেজ চৌধুরী জানান, ‘সন্ধ্যার পর এই বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। ফেডারেশন এবং অলিম্পিক কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে দ্রুত এই ভুল সংশোধন করা হবে।’

মিজানুর রহমান ডনের বিষয়টি যদি টাইপিং ভুল বা ফরম্যাট পরিবর্তনের ফল হয়, তবে বাস্তব চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কারণ দেখা যাচ্ছে, একাধিক ফেডারেশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কোচ পরিচয়ে বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। যেমন, ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী হাসিবুর রহমান, জুডো ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নয়না চৌধুরী এবং টেবিল টেনিস ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী সদস্য মোহসিনুল আলম—সবাই কোচ পরিচয়ে এই গেমসে অংশগ্রহণ করছেন।

ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এই বিষয়ে অনড় থাকলেও বর্তমান গেমসের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা দেখা যাচ্ছে বলে জানান পরিচালক জাহেদ পারভেজ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রীর অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার যে, আমরা কর্মকর্তাদের কোচ হিসেবে পাঠানোর ব্যাপারে অনুমোদন দেব না। তবে এই গেমসের ক্ষেত্রে যেহেতু কার্ড ইস্যু হয়ে গেছে এবং সময় একেবারেই নেই, তাই কিছুটা শিথিলতা রাখা হয়েছে। তবে যারা যাচ্ছেন, তারা কর্মকর্তা হলেও তাদের কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে।’

আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি ও নাগয়া শহরে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে ২০তম এশিয়ান গেমসের। এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় মোট ২২টি ডিসিপ্লিনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। প্রায় ৩০০ জনের দীর্ঘ এই তালিকায় বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন ১৫ জন অফিসিয়ালের নাম যুক্ত করেছে এনওসি (ন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি) ডেলিগেট হিসেবে। এই তালিকায় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল হকের তিনজন একান্ত সচিবের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তালিকায় দেখা যাচ্ছে, কিছু খেলায় কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়ের সংখ্যা প্রায় সমান, আবার কিছু খেলায় চরম বৈষম্য। উদাহরণস্বরূপ, মাত্র দুজন কুস্তিগিরের জন্য একজন কোচ থাকলেও কোনো ম্যানেজার নেই। পুরুষ ও মহিলা বিচ ভলিবলেও দুই দলের জন্য মাত্র দুজন কোচ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সাঁতারে দুজন সাঁতারুর সঙ্গে দলনেতা হিসেবে যাচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক স্বজল এবং কোচ নাজিম উদ্দিন।

এছাড়া বিওএ-র বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও ডেলিগেট হিসেবে সফরে যাবেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন উপ-মহাসচিব মাহবুবুর রহমান শাহীন, বক্সিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এম এ কুদ্দুস, ভলিবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান, রাগবির সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল জাহির স্বপন, মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদিকা ফিরোজা করিম নেলী এবং আর্চারি ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ। এদের মধ্যে অনেকে নিজ খরচে যাওয়ার কথা জানালেও, এত বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তার বিদেশ সফরে প্রাপ্তি কী, তা নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে এখন তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গেমসে খেলা মিস হওয়া বা নানা বিব্রতকর ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে।