জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মাদারীপুর জেলা আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করার পরপরই স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক। নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি দেশে যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলছে, তার বিপরীতে মাদারীপুর জেলা কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যাদের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে ৩৪ সদস্যের মাদারীপুর জেলা আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এই নতুন কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আতিকুর রহমান হাওলাদার এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন মো. ফরহাদ হোসেন। এছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক, যুগ্ম সদস্য সচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আরও বেশ কয়েকজন নেতাকে রাখা হয়েছে।
তবে কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে তুষার ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বিতর্কের ঝড় উঠেছে। তুষার ভূঁইয়া মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সরকারি গেজেটেও তার নাম ভাইস চেয়ারম্যান পদের প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, তুষার ভূঁইয়া একসময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির (বিএনপি) রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ২০১১ সালে তিনি সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের দাবি, তুষার ভূঁইয়া কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিমের অনুসারী হয়ে ওঠেন। এছাড়া বাহাউদ্দিন নাসিমের ছোট ভাই ও মাদারীপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে তিনি বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের মতো প্রভাবশালী পদগুলো লাভ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
তবে এসব গুরুতর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তুষার ভূঁইয়া। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমি মূলত বিএনপি পরিবার থেকে এসেছি। আমার বাবা একজন নেতা ছিলেন, সেই সূত্রে আমরা দীর্ঘ সময় বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আমাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। তাই আমরা এখন নতুনদের নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চাই এবং সেই লক্ষ্যেই নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিতে যোগ দিয়েছি।’ আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কাছ থেকে আমি কিছুই পাইনি। এ বিষয়ে আমার আর কিছু বলার নেই।’
তুষার ভূঁইয়ার এই রাজনৈতিক রূপান্তর এবং এনসিপির নেতৃত্বে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিপির সাবেক যুগ্ম সমন্বয়কারী মো. হাসিবুল্লাহ। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এবার এনসিপির জেলা কমিটিতে আওয়ামী লীগের তুষার ভূঁইয়াকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। তার আজীবনের রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি এবং তিনি গণঅভ্যুত্থানের ঘোর বিরোধী ছিলেন। একজন আওয়ামী লীগ অনুসারীকে কীভাবে এনসিপির মতো দলের নেতা বানানো হলো, তা শুনে আমরা অবাক। যারা দলের জন্য প্রকৃত পরিশ্রম করলাম, তারা পাশে নেই, অথচ নেতা হলেন তিনি!’
বিতর্ক কেবল আহ্বায়ক পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; জেলা সদস্য সচিব হিসেবে ইয়াজ্জেম হোসেন রোমানের নিয়োগ নিয়েও চলছে আলোচনা। রোমান শিবচর উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিবচর উপজেলা বিএনপির এক নেতা দাবি করেছেন, বিএনপিতে থাকাকালীন রোমান বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং অপকর্মে জড়িত ছিলেন, যার ফলে তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন। ওই নেতার মতে, রোমান একজন সুবিধাবাদী নেতা এবং যেখানেই সুযোগ পান, সেখানেই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করতে দ্বিধা করেন।
সাবেক বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এনসিপির জেলা কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোয় দলটির ‘নতুন রাজনীতি’র দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। স্থানীয় এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, কোনো ব্যক্তি আগে অন্য দল করলেও নতুন দলে যোগ দেওয়ার আইনি বাধা নেই। তবে একটি দল যখন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলে, তখন নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রার্থীর অতীত ভূমিকা এবং নৈতিকতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় দলের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এদিকে স্থানীয় একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করেছেন, তুষার ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে তাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন এবং তার ঘনিষ্ঠতা ছিল প্রশ্নাতীত। এমনকি তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্যপদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদনও করেছিলেন বলে তারা দাবি করেন। সব মিলিয়ে এনসিপির এই নতুন জেলা কমিটি মাদারীপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

















