একই সংসদ সদস্য, একই নির্বাচনী এলাকা—কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তার রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য ঘিরে বর্তমানে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিএনপির শাসনামলের দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে সংসদে তার করা মন্তব্য এবং কয়েক বছর আগের একটি পুরোনো বক্তব্যের মধ্যে চরম বৈপরীত্য লক্ষ্য করায় প্রশ্ন উঠেছে—রাজনৈতিক স্বার্থ কি মানুষের আদর্শিক অবস্থান বদলে দিতে পারে?
গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বিএনপির আমলের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ঋণখেলাপি সমস্যা এবং তৎকালীন সরকারের দুর্নীতি নিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও তীব্র সমালোচনা করেন রুমিন ফারহানা। তার বক্তব্যে বিএনপির শাসনকালকে বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্নীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়। সংসদ সদস্যের এই মন্তব্য করার পরপরই সংসদে এক উত্তপ্ত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রুমিন ফারহানার এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানায় বিএনপির প্রতিনিধিরা। এমনকি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে অভিহিত করেন।
সংসদে এই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের একটি পোস্ট ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। উক্ত পোস্টে রুমিন ফারহানাকে আওয়ামী লীগের অনুসারী এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়। এই আলোচনার সূত্রপাত হয় যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুমিন ফারহানার ২০২১ সালের একটি পুরোনো ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
প্রকাশিত সেই ভিডিওতে দেখা যায়, রুমিন ফারহানা তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে কথা বলছিলেন। সেখানে তিনি দাবি করেছিলেন যে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশ করা হলেও এর মূল সূত্রপাত হয়েছিল ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ আমলে। তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া পরিস্থিতির কারণেই বিএনপিকে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে 'দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। অর্থাৎ, যে বিষয়টিকে তিনি এখন সংসদে বিএনপির দোষ হিসেবে তুলে ধরছেন, কয়েক বছর আগে সেই একই বিষয়ে তিনি আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেছিলেন।
রুমিন ফারহানার এই দ্বিমুখী অবস্থান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ছাত্রদল নেতা রাকিবুল ইসলাম রাকিব তার একাধিক পোস্টে রুমিন ফারহানাকে নীতিহীন ও রাজনৈতিকভাবে অসংলগ্ন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে, সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও সংসদে রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সমালোচনা করেন এবং সংসদ সদস্যদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন জনপ্রতিনিধির জন্য এই ধরনের স্ববিরোধী অবস্থান গ্রহণ করা অত্যন্ত অসম্ভাব্য এবং এটি তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তনের সাথে সাথে রুমিন ফারহানার আদর্শিক অবস্থানও পরিবর্তিত হয়েছে। এমন অসংগতি কেবল তার রাজনৈতিক সততা নিয়েই প্রশ্ন তোলে না, বরং জনমানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতাকেও সংকটের মুখে ফেলছে।

















