দেশের কনসার্ট, বাউল গান, লোকসংগীত, নাটক, সিনেমা প্রদর্শনী এবং নৌকাবাইচের মতো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা প্রদান ও হামলা বন্ধ করার দাবি জানিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপ অথবা আপত্তির মুখে আইনসম্মত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ না করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে এই নোটিশে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভি এই নোটিশটি ডাকযোগে প্রেরণ করেন। নোটিশটি পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর।
আইনি নোটিশটিতে নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৭ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে জানানো হয়েছে যে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা নাগরিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত এবং এই অধিকারগুলো রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, পহেলা বৈশাখ, নৌকাবাইচ, লোকসংগীত, বাউল গান, নাটক এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসব অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে নানা বাধা ও আপত্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিল করার ঘটনা ঘটছে, যা সাংস্কৃতিক পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
নির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত মাসে কিশোরগঞ্জে স্থানীয় একটি গোষ্ঠীর আপত্তির মুখে প্রশাসনিকভাবে একটি কনসার্ট বাতিল করা হয়। একইভাবে সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুনাই নদীতে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ বন্ধ করার দাবি ওঠে। এছাড়া জনপ্রিয় শিল্পী অনুপম রায়ের ঢাকার একটি কনসার্ট শেষ মুহূর্তে স্থগিত হওয়ার ঘটনাটিও নোটিশে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
নোটিশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যেতে পারে, তবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির চাপের মুখে আইনসম্মত আয়োজন বেআইনিভাবে বন্ধ করা উচিত নয়। বাউল গান, পালাগান, যাত্রা, লোকনৃত্য এবং নাটকের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলাগুলো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতীক। তাই এসব অনুষ্ঠানের শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের হুমকি, হামলা, অপমান বা হয়রানি থেকে পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো গোষ্ঠী যেন হুমকি বা সহিংসতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে আইনসম্মত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নোটিশ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভি বলেন, বর্তমানে কনসার্ট, সংগীত অনুষ্ঠান, বাউল গান, নাটক ও সিনেমা প্রদর্শনীর মতো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের ওপর বিভিন্নভাবে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। শিল্পী, দর্শক এবং আয়োজকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই আইনি পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তিনি এই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করবেন।



















