যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বদলির ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। এই গুরুতর অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই ও অনুসন্ধানে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এই দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানে চার ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তলব করে চিঠি দিয়েছে দুদক। গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের বরাবর একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হলে এই বিষয়গুলো সামনে আসে।

দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপ-পরিচালক মো. জাহিদ কালাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চাহিদাকৃত সকল নথিপত্র দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। দুদকের তলব করা নথিপত্রের তালিকায় রয়েছে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত সকল নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ড। এছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকমূলে বদলি সংক্রান্ত সত্যায়িত ছায়ালিপি এবং ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব প্রদান, তা বাতিল এবং নতুন করে পদায়ন সংক্রান্ত সকল নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা, বগুড়া, বরিশাল, পাবনা, ধামরাই ও নরসিংদী জেলায় কর্মরত নির্দিষ্ট কয়েকজন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ফাইল ও নথিপত্রও তলব করা হয়েছে।

দুদকের এই অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপ-সচিব মো. মাসুম আহমেদসহ বেশ কিছু কর্মকর্তা। দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এই দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। উপ-পরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে গঠিত এই তদন্ত টিমে আরও সদস্য হিসেবে রয়েছেন সহকারী পরিচালক মো. নাছরুল্লাহ হোসাইন, উপ-সহকারী পরিচালক ইমরান আকন ও রোমান উদ্দিন।

অভিযোগের গভীরে যা পাওয়া গেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে পুনরায় পদায়নের আড়ালে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রায় ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতির প্রলোভন দেখিয়ে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং তাদের পছন্দের এলাকায় পদায়নের বিনিময়ে আরও ২ কোটি টাকা লেনদেন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। এই সিন্ডিকেটটি কেবল বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্যতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং যুব উন্নয়নের বিভিন্ন কেনাকাটা ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাত করেছে, যার মাধ্যমে অভিযুক্তরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সিন্ডিকেটের জাল মাঠ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মো. গোলাম মোস্তফা, মামুন, জাহিদ, আমীর (ঢাকা), আনিচ, জাহিদ, ইব্রাহিম (বগুড়া), জুলহাস (বরিশাল), নাকিমউদ্দিন, আলী হোসেন, আবু সাঈদ (পাবনা), কোরবান আলী (ধামরাই, ঢাকা) এবং আলী হোসেনসহ (নরসিংদী) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এই অসাধু চক্রটি পরিচালনা করতেন।

তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দুদকের অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, পদোন্নতির কোনো প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের পদায়ন বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে মন্ত্রীর অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না; বরং এই পুরো প্রক্রিয়াটি সচিবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। পিএসসির সুপারিশের ভিত্তিতে মেধা তালিকা প্রস্তুত করার দায়িত্ব সচিবের। তিনি দাবি করেন, এখানে সকল আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে। পরিশেষে তিনি জানান, বাস্তবতা উদ্ঘাটনের স্বার্থে তিনি যেকোনো তথ্য-উপাত্ত বা নথি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছেন।