ময়মনসিংহের গৌরীপুরে রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের বিতর্ক এবং সাংগঠনিক দ্বন্দ্বের মুখে পড়েছেন মো. জিএম সরকার জুয়েল। রামগোপালপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই তার রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে, যা স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও চরম অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মো. জিএম সরকার জুয়েল ইতিপূর্বে রামগোপালপুর ইউনিয়ন শাখা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটির ৯ নম্বর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে গত ১৯ মে উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের একটি নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই ১১ সদস্যের কমিটিতে মো. জিএম সরকার জুয়েলকে সভাপতি এবং মো. বাবু মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই নিয়োগের পরপরই তার রাজনৈতিক পটভূমি এবং দল পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে চলে আসে, যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নজরে আসার পর, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ময়মনসিংহ উত্তর জেলা শাখা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। গত ৩১ আগস্ট জিএম সরকার জুয়েলকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়। সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক ফারুক আহমেদের স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে জুয়েলকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের উপস্থিতিতে দলীয় কার্যালয়ে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে, পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে ১ সেপ্টেম্বর। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক-১ উমর ফারুক স্বাধীন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জিএম সরকার জুয়েলকে রামগোপালপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক মো. সোহেল রানার সিদ্ধান্ত অনুমোদনক্রমে এই বহিষ্কারাদেশ কার্যকর করা হয়েছে।
এই পুরো বিতর্ক ও বহিষ্কার প্রসঙ্গে জিএম সরকার জুয়েল নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমি অতীতে স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় যখন ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসররা আমার ছাত্র ভাইদের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তখন আমি রামগোপালপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মঞ্জুরুল হক মঞ্জুরের সাথে রাজপথে সক্রিয় হয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমার রাজনৈতিক আনুগত্য এবং সক্রিয়তা যাচাই-বাছাই করার পরেই আমাকে স্বেচ্ছাসেবক দলের ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে তার বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগেই তাকে একবার স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। বর্তমানে ওয়ার্ড সভাপতি হওয়ার পর পুনরায় ১ সেপ্টেম্বর বহিষ্কারের নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যা মূলত তাকে বিতর্কিত করার জন্য একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
অন্যদিকে, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক উমর ফারুক স্বাধীন ভিন্ন দাবি করে বলেন, ‘৫ আগস্টের মাত্র কয়েকদিন আগে জুয়েলকে রামগোপালপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটিতে ৭ নম্বর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এরপর তিনি হঠাৎ স্বেচ্ছাসেবক দলের ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি হয়ে যাওয়ায় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে বহিষ্কার করাটা অনিবার্য ছিল।’
পুরো বিষয়টি নিয়ে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আতাউর রহমান আল আমিন জানান, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন নেতারা তার সাথে কোনো প্রকার আলোচনা বা সমন্বয় না করেই রামগোপালপুর ইউনিয়নের ৩ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবক দলের দুটি পৃথক কমিটি গঠন করেছেন। বিষয়টি দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের নজরে আসার পর রামগোপালপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান কমিটির যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, পুরো বিষয়টি বিস্তারিত তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



















