কম্বোডিয়ার বিভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ডের দুঃসহ জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন ৩৮ জন বাংলাদেশি। উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন এবং নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের এই দেশটিতে পাঠানো হয়েছিল। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।

বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সিভিল এভিয়েশন সিকিউরিটি এবং প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সার্বিক সহযোগিতায় তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এই ফেরত আসা বাংলাদেশিদের জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা, মানসিক কাউন্সেলিং এবং নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার জন্য যাতায়াত খরচ প্রদান করে।

উল্লেখ্য যে, কম্বোডিয়া সরকার ১ সেপ্টেম্বর থেকে একটি বিশেষ সুযোগ প্রদান করেছে, যার ফলে অতিরিক্ত সময় অবস্থানরত বিদেশিরা কোনো জরিমানা ছাড়াই স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যেতে পারছেন। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েই এই ৩৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। এর আগে গত জুন মাসেও ৫৮৩ জন বাংলাদেশি একইভাবে দেশে ফিরেছিলেন। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এখনো প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় আটকা পড়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন বলে জানা গেছে।

দেশে ফিরে আসা ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা অবিলম্বে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে, তাদের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে এই মানবপাচার চক্রের সাথে জড়িত দালাল এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “কম্বোডিয়ার বিভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে এই বাংলাদেশিদের আটকে রেখে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমে নিয়োজিত করা হয়েছিল। ফেরত আসা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দেশে ফেরার পথেও তাদের শান্তি দেওয়া হয়নি। কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত কিছু বাংলাদেশি মানবপাচারকারী তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন এবং নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে দেশে ফিরে আসতে বাধা দিয়েছেন।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “সাইবার স্ক্যাম বর্তমানে মানবপাচারের এক অত্যন্ত আধুনিক এবং ভয়াবহ রূপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। উন্নত দেশে উচ্চ বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশিদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে তাদের জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে লাগানো হয়। যখন তারা নির্ধারিত টার্গেট পূরণ করতে ব্যর্থ হন, তখন তাদের ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এই চক্রের সাথে জড়িত দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রকে শনাক্ত করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।”

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে মোট ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গিয়েছেন। তবে সরকারি তথ্যের বাইরে ভুক্তভোগীদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, সেখানে এখনো হাজার হাজার বাংলাদেশি চাকরি না পেয়ে অথবা প্রতারণার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের অধিকাংশকেই উচ্চ বেতনের চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। গত জুন মাসে ফিরে আসা ৫৮৩ জনের অনেকের কাছেই বিএমইটির ছাড়পত্র ছিল, যা প্রমাণ করে যে বৈধ প্রক্রিয়ায় গেলেও অনেকে প্রতারিত হয়েছেন।

এই ধরণের প্রতারণা শুধু কম্বোডিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছিলেন। তাদেরও থাইল্যান্ড সীমান্ত হয়ে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে। সেখানে পৌঁছানোর পরপরই তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং জোরপূর্বক সাইবার প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করা হয়।

ব্র্যাকের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, পাচারকারীরা কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ এবং কাস্টমার সার্ভিসসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পদের চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রলোভন দেখায়। ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হয়। পরবর্তীতে চাকরিপ্রার্থীদের স্ক্যাম কম্পাউন্ডে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখা হয় এবং অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়। এই ভয়াবহ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ব্র্যাক বিশেষভাবে সতর্ক করে জানিয়েছে যে, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য।