অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব গুরুতর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এখন পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই তদন্তের আওতায় এসেছেন সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের পাশাপাশি তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম-সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং যুব-১ শাখার উপ-সচিব মো. মাসুম আহমেদ। মূলত নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি এবং পদায়নের নামে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন টেন্ডার ও কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়ম করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
তদন্ত প্রক্রিয়ার সূত্র অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুদকের বিশেষ তদন্ত বিভাগের মহাপরিচালকের বিশেষ নির্দেশনার পর কার্যক্রম গতিপ্রাপ্ত হয়। এরপর বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের বরাবর একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় সকল তথ্য ও নথিপত্র তলব করা হয়েছে। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে নিয়োজিত দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর গভীরে গিয়ে দেখা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে ‘নেপথ্যের নায়ক’ হিসেবে কাজ করেছেন তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম। এছাড়া যুগ্ম-সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ও উপ-সচিব মো. মাসুম আহমেদকে তথাকথিত ‘সেফ গার্ড’ দিয়ে প্রভাবশালী অবস্থানে বহাল রাখার অভিযোগও রয়েছে। এই জটিল ও সংবেদনশীল অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের লক্ষ্যে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি বিশেষ অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে। এই দলে আরও রয়েছেন সহকারী পরিচালক নাছরুল্লাহ হোসাইন, উপ-সহকারী পরিচালক ইমরান আকন এবং উপ-সহকারী পরিচালক রোমান উদ্দিন।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু নথিপত্র চেয়েছে। বিশেষ করে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পন্ন হওয়া বিভিন্ন নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বদলিসংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র ও মাঠ-পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ফাইল চাওয়া হয়েছে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই সমস্ত তথ্য ও রেকর্ডপত্র কমিশনে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুদকের তলব করা নথির মধ্যে রয়েছে—আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ, পদোন্নতি বা বদলি করা হয়েছে, তাদের বিস্তারিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড। এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ৭ মে এবং ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিলের দুটি স্মারকের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া বদলিসংক্রান্ত নথির সত্যায়িত ছায়ালিপি চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি বিশেষ স্মারকের অধীনে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব প্রদান, বাতিল এবং পদায়নসংক্রান্ত নথির সত্যায়িত কপিও তলব করেছে কমিশন।
একই চিঠিতে মাঠ-পর্যায়ের বেশ কয়েকজন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত ছায়ালিপি চাওয়া হয়েছে। যাদের নাম তালিকায় এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার গোলাম মোস্তফা, মামুন, জাহিদ ও আমির; বগুড়ার আনিচ, জাহিদ ও ইব্রাহীম; বরিশালের জুলহাস; পাবনার নকিমউদ্দিন, আলী হোসেন ও আবু সাঈদ; ধামরাইয়ের কোরবান আলী এবং নরসিংদীর আলী হোসেন। এই কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ফাইলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকল বিধিবিধান ও সহায়ক রেকর্ডপত্র অনুসন্ধান দলের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পদায়ন ও পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ রয়েছে যে, কর্মকর্তাদের পছন্দের জায়গায় পদায়ন এবং দ্রুত পদোন্নতি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন টেন্ডার ও কেনাকাটায় একটি বিশেষ ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়ম করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, ‘পদোন্নতি, বদলি বাণিজ্য এবং পদায়নসহ বিভিন্ন অভিযোগে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।’
দুদকের টেবিলে জমা পড়া অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন করে পদায়নের আদেশের মাধ্যমে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি কর্মকর্তার কাছ থেকে গড়ে প্রায় দুই লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। এছাড়া ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, তাদের পদোন্নতির জন্য মোট এক কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য আরও দুই কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে লেনদেন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে শুধু নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন সংক্রান্ত অভিযোগের আর্থিক অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। এই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন টেন্ডার এবং কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এখন অনুসন্ধানের আওতায়। অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে।
মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ অনিয়মের বাইরেও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ঘুষ গ্রহণ, বিদেশে অর্থ পাচার, অবৈধ বিটকয়েন লেনদেন, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ক্রীড়া উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কার্যক্রমে অনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের পরিধিতে আসতে পারে বলে জানা গেছে। এসব সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে তার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের মধ্যস্থতার কথা অভিযোগপত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে দুদকের এই বিশেষ অনুসন্ধান দলের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট সবাই।



















