স্পেনের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই রোমাঞ্চকর কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক মুহূর্তটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক অমলিন স্মৃতি হয়ে থাকবে। অতিরিক্ত সময়ের শ্বাসরুদ্ধকর নাটকীয়তায় ১-০ ব্যবধানে হেরে যখন নিভে গেল আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন, তখন ফুটবল বিশ্বের অনেক বিশ্লেষকেরই ধারণা ছিল যে নিজ দেশের মাটিতেই শুরু হবে সমালোচনার প্রবল ঝড়। সাধারণত ফুটবল উন্মাদনা এবং প্রত্যাশার চাপে খেলোয়াড়দের ওপর যে কঠোর চাপ তৈরি হয়, তেমন কিছুর প্রত্যাশা ছিল ভক্তদের। তবে বাস্তব চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এবং অভাবনীয়। বিশ্বমঞ্চে লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ ম্যাচের এই পরাজয়কে শোক বা ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে, বরং রক্ত-ঘাম ঝরানো খেলোয়াড়দের প্রতি অকুন্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বরণ করে নিয়েছে পুরো আর্জেন্টিনা। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সাবেক তারকা এবং স্বয়ং প্রেসিডেন্ট—সবার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে একটাই কথা, ‘এই দলের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, তারা আমাদের অহংকার।’
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘ক্লারিন’ তাদের প্রচ্ছদে লিওনেল মেসির সেই অশ্রুসজল ও বেদনাকাতর মুখের ছবি ছেপে শিরোনাম করেছে, ‘তারা নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে, তাদের দোষ দেওয়ার কিছুই নেই।’ পত্রিকাটির দীর্ঘ ও আবেগঘন সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, খেলার ফলাফল বা মাঠের হিসাব যাই হোক না কেন, দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে জাতীয় দলের এমন এক গভীর আত্মিক বন্ধন এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এই পরাজয় তাদের মাথা নত করেনি, বরং দলের প্রতি ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সুর শোনা গেছে ‘লা নাসিওন’ পত্রিকার শিরোনামেও, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘আর্জেন্টিনা নিজেদের সেরাটা দিয়ে লড়েছে, তারাই এই জাতির প্রকৃত গর্ব।’ অন্যদিকে, ‘পাগিনা ১২’ তাদের প্রচ্ছদে লিখেছে ‘ইতিহাসের পাতায় চিরন্তন’, এবং উল্লেখ করেছে যে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে মেসি ও স্কেলোনির এই অনন্য দল নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখেছে, যা কোনো ট্রফি দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। খেলাধুলাবিষয়ক জনপ্রিয় পত্রিকা ‘ওলে’ জাতীয় সংগীতের আবেগঘন লাইন ধার করে শিরোনাম করেছে, ‘তারা যেন অমর হয়ে থাকে।’
ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে দেখা গেছে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ অবস্থায়। কান্নাভেজা চোখে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা রেখে তিনি বলেন, ‘ছেলেরা আজ যেভাবে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে, তা দেশের মানুষের জন্য একটি অনন্য উদাহরণ। এমন হারের পর মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন, কিন্তু যখন কেউ মাঠের বুকে নিজের শেষ বিন্দুটি দিয়ে আসে, তখন তার খেলায় ভুল খোঁজা সত্যিই অসম্ভব।’ স্কালোনির এই মানবিক ও আবেগঘন বক্তব্যের ভূয়সী প্রশংসা করে রিভার প্লেটের সাবেক সফল কোচ মার্সেলো গ্যালার্দো বলেন, এত বড় ধাক্কার পরও স্কালোনি যে সততা ও মর্যাদার সঙ্গে কথা বলেছেন, তা তার গভীর মানবিক সত্তাকে প্রকাশ করে। গ্যালার্দো আরও বিশ্লেষণ করে যোগ করেন, সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই কঠিন লড়াই দলের আবেগ ও শারীরিক শক্তি অনেকটাই শুষে নিয়েছিল, যার প্রভাব ফাইনালে পরিলক্ষিত হয়েছে। তাছাড়া স্পেনের মতো বল দখলে দক্ষ এবং কৌশলগতভাবে শক্তিশালী দলের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা এই টুর্নামেন্টে আগে কখনো হয়নি।
ক্রীড়া কলামিস্ট আলেহান্দ্রো ওয়াল স্পেনের পারফরম্যান্সকে ফুটবলের এক ‘ঝড়’ হিসেবে বর্ণনা করে লিখেছেন, পুরো ম্যাচজুড়ে স্প্যানিশদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। আর্জেন্টিনা কেবল ম্যাচটি টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে, কিন্তু স্পেনের কৌশলের কাছে তারা পরাস্ত হয়েছে। পরিসংখ্যানের বিচারে তাদের নিষ্প্রভ মনে হলেও, পুরো টুর্নামেন্টে আলবিসেলেস্তাদের এই যাত্রা ছিল সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। ম্যাচ শেষে অশ্রুসজল চোখে ভক্তদের গ্যালারির দিকে সোজা তাকিয়ে বিদায় জানানোই প্রমাণ করে, সমর্থকদের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা কতটা গভীর ছিল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে এই দলের পাশে দাঁড়িয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। রেডিও মিত্রেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ফলাফল হয়তো আমাদের মনের মতো হয়নি, কিন্তু এই দলটির ঐতিহাসিক অর্জনকে আমাদের স্বীকৃতি দিতেই হবে। শেষ চারটি বিশ্বকাপের তিনটিতেই তারা ফাইনালে উঠেছে এবং একটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর এই ফাইনালটিও তারা হেরেছে অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে। তারা মাঠের বুকে সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে, তাই তাদের প্রতি কারো কোনো ক্ষোভ থাকতে পারে না।’











