যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ বা গ্রিন কার্ড পেতে ইচ্ছুক আবেদনকারীদের জন্য ১ লাখ ডলারের (১,০০,০০০ ডলার) একটি বন্ড বা জামানত বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে মার্কিন প্রশাসন। অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং আবেদনকারীদের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, অভিবাসীরা যাতে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারেন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বরং সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, এই বিষয়ে তারা মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা, ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশিদের ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেবা বা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনের কারণে সরকারি কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমানোর উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

পিগট আরও জানান, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট (INA)-এর দীর্ঘদিনের একটি আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশেষ কিছু ভিসা আবেদনকারীর কাছ থেকে এই বন্ড নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হতে পারে। এই বন্ডের মাধ্যমে আবেদনকারীরা প্রমাণ করতে পারবেন যে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, অবৈধ অভিবাসন দমনে ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গণহারে বহিষ্কারের পাশাপাশি ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা জন্ম পর্যটন সীমিত করার লক্ষ্যে নতুন আইন প্রস্তাব করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় অভিবাসীদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে এই ছয় অঙ্কের বিশাল বন্ড আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এটি প্রথমবারের মতো প্রস্তাব করা হচ্ছে এমন নয়। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি (H-1B) ভিসা আবেদনকারীদের জন্যও ১ লাখ ডলার ফি চালুর চেষ্টা করেছিল। তবে তৎকালীন সময়ে ফেডারেল আদালত সেই উদ্যোগটি বাতিল করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, প্রশাসন তার আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে এবং অভিবাসন নীতি নির্ধারণ ও কর আরোপের চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের হাতেই ন্যস্ত।

বর্তমানে গ্রিন কার্ডের আবেদন ফি আবেদনকারীর ক্যাটাগরি এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে আবেদন করছেন নাকি বাইরে থেকে—তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ফর্ম I-485-এর জন্য সাধারণত ১,৪৪০ ডলার ফি দিতে হয়। এর বাইরে কর্মসংস্থানের অনুমতি (ওয়ার্ক পারমিট) এবং ভ্রমণ সংক্রান্ত নথির জন্য আলাদা ফি প্রযোজ্য হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ডিএস-২৬০ (DS-260) ভিসা আবেদন ফি হিসেবে ৩২৫ ডলার এবং ভিসা অনুমোদনের পর মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা (USCIS)-কে ২৩৫ ডলার ফি প্রদান করতে হয়। বর্তমান এই ফি-র তুলনায় ১ লাখ ডলারের বন্ডের বিষয়টি একটি বিশাল পরিবর্তন এবং সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

প্রস্তাবিত এই নীতি অনুযায়ী, আবেদনকারী নিজে অথবা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তার পরিবারের সদস্যরা এই অর্থ জমা দিতে পারবেন। নির্ধারিত শর্তাবলি যথাযথভাবে পূরণ হলে পরবর্তীতে এই জামানতের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। তবে এই বন্ডের প্রাথমিক প্রয়োগ ইতিমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে শুরু হয়েছে। গত আগস্ট থেকে মালাউই ও জাম্বিয়ার কিছু নির্দিষ্ট ভিসাধারীর জন্য ১৫ হাজার ডলারের বন্ড চালু করা হয়েছে। যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের নির্ধারিত সময় অতিক্রম করেন অথবা পরবর্তীতে রাজনৈতিক আশ্রয়সহ অন্য কোনো অভিবাসন সুবিধার জন্য আবেদন করেন, তবে সেই জামানতের অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হবে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফ্রিকার আরও ৫০টি দেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই বন্ড ব্যবস্থার ফলে প্রায় ৯৭ শতাংশ ভিসাধারী তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশ ত্যাগ করেছেন। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, এই কঠোর শর্তের কারণে ভিসা ইস্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।