যুদ্ধের বিভীষিকা আর চরম খাদ্যসংকটে বিপর্যস্ত গাজা। সেখানে দীর্ঘ তিন দশক ধরে বসবাস করা এক বাংলাদেশির জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। পাঁচ সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে, অর্থাৎ নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন আবু হুসাইন কারিম রালী।

চাঁদপুরের সন্তান আবু হুসাইন কারিম রালীর জীবন গাজার সঙ্গে মিশে গেছে শৈশব থেকেই। বাবার চাকরির সূত্রে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাংলাদেশ ছেড়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন ফিলিস্তিনে। তাঁর বাবা সাধারণ কোনো কর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতের অত্যন্ত বিশ্বস্ত দেহরক্ষি। পরবর্তীতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও সহযোগিতার ফলে তাঁর পরিবার গাজাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেই থেকে গাজাই হয়ে ওঠে কারিম রালীর জীবনের একমাত্র ঠিকানা।

কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখার পর গাজাতেই এক ফিলিস্তিনি নারীকে বিয়ে করে সংসার পাতেন আবু করিম। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে জন্ম নেয় পাঁচ সন্তান। বর্তমানে ৩৫ বছর বয়সী আবু করিমের মনে সর্বদা গেঁথে থাকে জন্মভূমি বাংলাদেশের স্মৃতি। সন্তানদের কাছে তিনি প্রায়ই গল্প করেন সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের কথা। গাজায় ইমামতির সামান্য আয়ে জীবন অতিবাহিত করলেও, শুরুর দিকে তাঁদের পারিবারিক জীবন ছিল সুখের। ২০১৪ সালের যুদ্ধের ভয়াবহতার মুখে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা গাজা ছেড়ে চলে গেলেও, আবু করিম থেকে গিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় গাজার মানুষের পাশে। ধ্বংসস্তূপ আর গোলাবর্ষণের মাঝেও তিনি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন।

তবে বর্তমান যুদ্ধ আবু করিমের জীবনের সমস্ত হিসাব ও স্বপ্ন ওলটপালট করে দিয়েছে। এখন প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে চরম আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। যুদ্ধের প্রাণহানির চেয়েও তাঁকে বেশি তাড়া করছে সন্তানদের অনাহার। প্রতিটি দিনই এখন এক জীবনযুদ্ধ। এই চরম সংকটের মুহূর্তে তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না; এখন তাঁর একমাত্র চাওয়া স্বপরিবারে বাংলাদেশে ফিরে আসা।

সম্প্রতি মিশরে অবস্থানরত এশিয়া পোস্টের একজন প্রতিবেদকের কাছে তাঁর এই করুণ আর্তি পৌঁছে দেন আবু করিম। আরবি ভাষায় লেখা সেই বার্তায় তিনি লিখেছেন, “এই যুদ্ধটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত। জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম উপকরণ ও সম্পদের তীব্র সংকটে পড়েছি আমরা। পরিবার নিয়ে গাজা থেকে বের হওয়ার জন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। মিশরে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চেয়েছি, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রচেষ্টাই সফল হয়নি। গাজায় যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, চারদিকে শুধু ভয় আর অনিশ্চয়তা। কঠোর অবরোধের কারণে আমরা আটকা পড়ে আছি। আমি শুধু আমার স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে চাই। গাজার সাধারণ মানুষের মতো আমিও প্রতিদিন অভাব আর সংকটের সাথে লড়াই করছি। আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কোনো সহায় নেই।”

এই মানবিক সংকটের কথা জানিয়েছেন মিশরে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের সহায়তায় কাজ করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ওয়ান উম্মাহ ফাউন্ডেশন’-এর চেয়ারম্যান হুজাইফা খান। তিনি জানান, আবু করিমের পরিবারটিকে প্রথমে মিশর হয়ে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। পরবর্তীতে জর্ডান হয়ে বাংলাদেশে আনার আরেকটি বিকল্প পথ খোঁজা হলেও তা ব্যর্থ হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অসহায় পরিবারটিকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ সহায়তা ও হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।