মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মধ্যকার সম্পর্ক এখন বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলোরিন বালোগানের বিরুদ্ধে দেওয়া একটি বিতর্কিত লাল কার্ড বাতিল করার বিষয়ে ফিফা প্রধানের নেওয়া সিদ্ধান্তকে ‘চমৎকার’ বলে অভিহিত করেছেন ট্রাম্প। তবে প্রেসিডেন্টের এই প্রকাশ্য প্রশংসা এবং ক্রীড়া সংস্থায় তাঁর সরাসরি হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ফিফার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার মৌলিক নিয়মাবলি লঙ্ঘন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে।

আগামীকাল রোববার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচের প্রাক্কালে নিউইয়র্কের আইকনিক ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সম্মানে এক বিশেষ সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। এই জমকালো অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়িয়েই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিতর্কিত মন্তব্যগুলো করেন। সপ্তাহব্যাপী চলমান টুর্নামেন্টের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য মুহূর্তের কথা আলোচনা করতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলোরিন বালোগানের লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনাটিকে টুর্নামেন্টের ‘সম্ভবত সবচেয়ে অবিস্মরণীয় মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১ জুলাই, যখন বসনিয়ার বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয় বালোগানকে। রেফারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে পরবর্তী এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে এই নিষেধাজ্ঞার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করেন এবং বালোগানের নিষেধাজ্ঞা দ্রুত প্রত্যাহারের জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করেন। আশ্চর্যজনকভাবে, ফিফা পরবর্তীতে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং বালোগানকে পুনরায় খেলার অনুমতি দেয়। ফিফার এই নমনীয় সিদ্ধান্ত এবং ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের বিষয়টি ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

৮০ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত শুক্রবারের অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি জিয়ান্নিকে ফোন করতে এবং একটি সুপারিশ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমি তাঁকে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, “জিয়ান্নি, আমি একটি বিশেষ সুপারিশ করতে চাই: ওকে দ্রুত খেলায় ফিরিয়ে নাও!”... সত্যি বলতে, এরপর আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না।’

প্রেসিডেন্টের এই হস্তক্ষেপের পর ৬ জুলাই বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে মাঠে নামেন স্ট্রাইকার বালোগান। তবে মাঠের লড়াইয়ে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামের কাছে ১-৪ গোলে শোচনীয়ভাবে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারলেও নিজের সেই হস্তক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন ট্রাম্প। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘ফলাফল যেভাবে এসেছে তা অনেক ভালো, কারণ এখন এখানে কোনো বিতর্ক নেই। বেলজিয়াম খেলায় জিতেছে এবং আমাদের দল তাদের সব তারকা খেলোয়াড়কে মাঠে পেয়েছিল।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও যোগ করেন, ‘ভেবে দেখুন, যদি ইনফান্তিনো তাকে অনুমতি না দিতেন এবং আমরা হেরে যেতাম, তবে সবাই বলত আমাদের সেরা খেলোয়াড় থাকলে হয়তো আমরা জিতে যেতাম। তাই জিয়ান্নি আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনি অনেক ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’

তবে ট্রাম্পের এই যুক্তি ফুটবল সংশ্লিষ্টদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (উয়েফা) ফিফার এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘অভূতপূর্ব এবং সম্পূর্ণ অসমর্থনযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি প্রথম খবরটি শুনে ভেবেছিলেন এটি হয়তো কোনো কৌতুক। বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন ইতিমধ্যে জানিয়েছে, তারা এই অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞ সাইরাস জ্যানসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘এই ঘটনা মার্কিন দলের জন্য একটি চরম উভয়সংকট তৈরি করেছে। আমরা যদি বেলজিয়ামকে হারাতাম, তবে সেই জয় কলঙ্কিত হতো কারণ জয়ের জন্য আমাদের প্রেসিডেন্টের কারচুপির সাহায্য প্রয়োজন হয়েছিল। আর যখন আমরা হেরেছি, তখন এটি প্রমাণ করল যে প্রেসিডেন্টের অনৈতিক সাহায্যও আমাদের জেতাতে পারেনি।’

তীব্র সমালোচনার মুখে গত ৬ জুলাই ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করেন, ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে। তিনি বলেন, ‘ফিফার বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত। তারা ফিফার শৃঙ্খলা বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করে এবং কেবল নির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়।’ তবে এই সাফাইয়ের পর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) কাছে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

টুর্নামেন্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের পর খোদ মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলোরিন বালোগানও স্বীকার করেছেন যে, ট্রাম্পের এই ‘অনন্য’ হস্তক্ষেপ দলের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছিল। চলতি সপ্তাহে সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘দলে ফিরতে পেরে আমার ভালো লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু পরে যখন বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবলাম, তখন বুঝতে পারলাম এটি অনেক বিতর্কের জন্ম দিতে যাচ্ছে। আমার সতীর্থদের মধ্যেও আমি এক ধরনের নার্ভাসনেস বা উদ্বেগ লক্ষ্য করছিলাম, কারণ এই ধরনের ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে সত্যিই নজিরবিহীন।’

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প তাঁর অন্যান্য নিয়মিত রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিষয়েরও অবতারণা করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ভবিষ্যতে মেক্সিকো এবং কানাডার সহযোগিতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারে। এ ছাড়া তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের নির্বাচনী জালিয়াতির বিতর্কিত ও ভিত্তিহীন দাবিগুলোও পুনরায় ব্যক্ত করেন, যা অনুষ্ঠানটিকে ক্রীড়া সংবর্ধনার চেয়ে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করেছিল।