ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেট, সদর স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট এবং মার্কুইস স্ট্রিটের মতো ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো একসময় বাংলাদেশি পর্যটকদের পদচারণায় অত্যন্ত প্রাণচঞ্চল থাকত। তবে গত প্রায় দুই বছর ধরে সেই পরিচিত কোলাহল ও ব্যস্ততা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসা সেবা গ্রহণ, কেনাকাটা, উচ্চশিক্ষা কিংবা নিছক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আসা বাংলাদেশি নাগরিকরা দীর্ঘকাল ধরে কলকাতার অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিন্তু পর্যটন ভিসা স্থগিত থাকার ফলে এই স্বাভাবিক ছন্দ বাধাগ্রস্ত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় ব্যবসায়িক খাতের ওপর। বিশেষ করে হোটেল রুম বুকিংয়ের হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়, খুচরা বিক্রেতারা তীব্র মন্দার মুখে পড়েন এবং আন্তঃসীমান্ত পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলো যাত্রীসংখ্যার ব্যাপক ঘাটতির কথা জানায়।
তবে সেই স্থবিরতার কালো মেঘ এখন কাটতে শুরু করেছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নিয়মিত পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর বিষয়ে ভারতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত কলকাতার ব্যবসায়ী মহলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে এই পদক্ষেপটি কেবল একটি সাধারণ কনস্যুলার সিদ্ধান্ত নয়; বরং তারা এটিকে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা ভারত-বাংলাদেশের গভীর জনসম্পর্কের এক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
মজার বিষয় হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি এসেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এক সময়ে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনী প্রচারণার প্রস্তুতি শুরু হতেই অবৈধ অভিবাসন বিষয়টি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর (SIR), কঠোর সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অনিবন্ধিত অভিবাসন বর্তমানে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি দাবি করে আসছিল যে, অবৈধ অভিবাসনের কারণে ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছিল যে, বহু বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিককে পরিচয় যাচাইয়ের নামে হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। এই রাজনৈতিক বিতর্ক শেষ পর্যন্ত আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছায় এবং বেশ কিছু মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
এই অস্থিরতা কেবল পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না। একই সময়ে দিল্লি, গুজরাট, কর্ণাটক, ওডিশা এবং তেলেঙ্গানাসহ ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্য থেকে খবর পাওয়া গিয়েছিল যে, বাংলাভাষী অভিবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। যদিও পরবর্তী সময়ে কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ভুল স্বীকার করা হয়, তবে মানবাধিকারকর্মীরা সতর্ক করে বলেন যে, সীমান্ত নিরাপত্তা রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব হলেও ভুল পরিচয় নির্ধারণ এবং প্রক্রিয়াগত ত্রুটি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং নাগরিকদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ তৈরি করে। যদিও কেন্দ্রীয় সরকার ধারাবাহিকভাবে দাবি করে এসেছে যে, সমস্ত যাচাই কার্যক্রম ভারতীয় আইনের কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক বাস্তবতায় আরও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেখানে ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব পুনরায় স্বীকৃত হয়। নয়াদিল্লির কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর সীমান্ত নিরাপত্তা এবং গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একে অপরের বিরোধী নয়। তাদের বিশ্বাস, আন্তঃসীমান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার টেকসই সমাধান নিহিত রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সমন্বয়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক সংলাপের মধ্যে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বর্তমানে তীব্র হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিউ মার্কেট ও আশপাশের বাণিজ্যিক এলাকার শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি মনতোষ সাহা এই বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশি পর্যটকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, 'কলকাতা সব সময়ই বাংলাদেশের মানুষকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে। তারা আমাদের অতিথি হিসেবে এখানে আসেন এবং তাদের সাথে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা আমাদের দায়িত্ব।' মনতোষ সাহার ভাষ্যমতে, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কলকাতা পুলিশ ও কলকাতা পৌর করপোরেশনের সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে প্রায় ৩৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। এছাড়া হোটেল মালিক, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান, পরিবহন সেবাদাতা এবং খুচরা বিক্রেতারা একাধিক সমন্বয় সভা করেছেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশি পর্যটকেরা যেন আগের মতোই কলকাতায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং নিজেদের নিরাপদ মনে করেন।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, বাংলাদেশি পর্যটকদের প্রত্যাবর্তনের সুফল কেবল নিউ মার্কেট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। মুকুন্দপুর, সল্ট লেক ও নিউ টাউনের নামী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি পূর্ব ভারতের হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং খুচরা বাণিজ্য খাত ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে নয়াদিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গে একই রাজনৈতিক জোট ক্ষমতায় থাকায় ব্যবসায়ীরা আরও বেশি আস্থাশীল। তারা বিশ্বাস করছেন যে, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো বৈধ কাগজপত্র নিয়ে আসা পর্যটকদের জন্য একটি নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করবে।











