প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে বর্ষা ঋতু কমবেশি সবারই প্রিয়। বৃষ্টির রিমঝিম ধারাপাত মনকে প্রফুল্ল করে তুললেও, স্বাস্থ্যের দিক থেকে এই ঋতুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। চারপাশের স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ার কারণে এই সময়ে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া এবং বিভিন্ন ধরণের ভাইরাল ইনফেকশনের প্রাদুর্ভাব বহুগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের শরীরের স্বাভাবিক হজমশক্তি হ্রাস পায়, অন্যদিকে রোগজীবাণুগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে সামান্য অসাবধানতার ফলেই জ্বর, সর্দি ও কাশির মতো সমস্যা দেখা দেয়। আর্দ্র আবহাওয়ায় হজমপ্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়ায় পেটের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই এই ঋতুতে সুস্থ থাকতে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে কিছু বিশেষ পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।
১. যেসব খাবার বেশি করে খাবেন (করণীয়)
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আপেল, আনারস, বেদানা ও পেয়ারার মতো মৌসুমি ফল এবং প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি যুক্ত ফল রাখা প্রয়োজন। শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে ডিম, ডাল, সয়াবিন ও বিভিন্ন ধরণের বাদাম খাওয়া উচিত। বিশেষ করে কাজু, কিশমিশ, পেস্তা, কাঠবাদাম ও খেজুরে থাকা ফাইবার এবং অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট শরীরকে রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
রান্নায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে রসুনের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া লিকার চা বা হার্বাল টি-তে আদা, মধু, গোলমরিচ, পুদিনা বা তুলসী পাতা মিশিয়ে পান করলে ঠান্ডা ও সর্দি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রোধ করতে প্রতিদিনের ডায়েটে হলুদ-দুধ (Turmeric Milk) রাখা অত্যন্ত কার্যকর। পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে টক দই বা ইয়োগার্ট এবং নিয়মিত করলা সেদ্ধ, নিমপাতা বা মেথি খাওয়া যেতে পারে। এছাড়া সহজপাচ্য ও ফাইবারযুক্ত খাবার যেমন—ওটস, বার্লি ও ব্রাউন রাইস নিয়মিত খেলে হজমের সমস্যা কমে। মাছ বা মাংস রান্নার ক্ষেত্রে মশলার পরিমাণ কমিয়ে হালকাভাবে রান্না করা স্বাস্থ্যের জন্য শ্রেয়।
২. যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন (বর্জনীয়)
ডায়রিয়া, টাইফয়েড, আমাশয় ও বদহজমের ঝুঁকি এড়াতে এই সময়ে কাঁচা সবজি ও সালাদ খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। বিশেষ করে কাঁচা শসা, পেঁয়াজ ও টমেটোর সালাদ এড়িয়ে চলুন। সবজি কাঁচা না খেয়ে অল্প জলে ভাপিয়ে বা সেদ্ধ করে খাওয়া নিরাপদ। বাইরের খোলা খাবার বা স্ট্রিট ফুড এই সময়ে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত। পাশাপাশি অসময়ের ফুলকপি, বরবটি, রাজমা ও ছোলার ডাল কম খাওয়াই ভালো।
বর্ষায় মাটিতে জন্মানো মাশরুমে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি থাকে, তাই তা এড়িয়ে চলুন। এছাড়া দুগ্ধজাত কিছু খাবার, বিশেষ করে সাধারণ দই অনেক ক্ষেত্রে পেটের গণ্ডগোল তৈরি করতে পারে। হজম ক্ষমতা দুর্বল থাকায় রেড মিট বা গরু ও খাসির মাংস এড়িয়ে চলা উচিত। উল্লেখ্য যে, এই সময়টি অনেক মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজননকাল এবং তাদের আঁশে বিভিন্ন আবর্জনা জমে থাকে, ফলে এসব মাছ খেলে বিষক্রিয়ার আশঙ্কা থাকে।
অতিরিক্ত লবণ এবং চিপস, ডালমুট বা নোনতা বাদামের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন; এতে শরীরে জল জমে পেট ফোলার (bloating) সমস্যা কমে। যাদের ত্বকে ব্রণ বা র্যাশের সমস্যা আছে, তাদের জন্য তৈলাক্ত ও অতিরিক্ত মশলাদার খাবার বর্জন করা জরুরি।
৩. রান্নায় বাড়তি সতর্কতা
শাকসবজি রান্নার আগে অন্তত আধা ঘণ্টা লবণ-পানিতে ভিজিয়ে রাখা উচিত। এতে সবজিতে লেগে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ধ্বংস হয়, যা আমাদের ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা করে। এছাড়া মৌসুমের শেষের আম খাওয়া গেলেও তা পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত, অন্যথায় ওজন বৃদ্ধি বা ত্বকে ব্রণের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৪. ঘরবাড়ি ও চারপাশের পরিচ্ছন্নতা
ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচতে বাড়ির আশেপাশে বা কোনো পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। ঘরের দেয়ালে পানি চুইয়ে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক যাতে জন্ম না নেয় এবং ঘর যেন স্যাঁতস্যাঁতে না হয়ে থাকে, তার যথাযথ ব্যবস্থা করুন। এছাড়া বর্ষায় উপদ্রব বাড়ায় সাপ, জোঁক ও বিভিন্ন পোকামাকড় থেকে বাঁচতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, বর্ষার রূপ-রস উপভোগ করার পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া এই সময়ের প্রধান দায়িত্ব। সামান্য সচেতনতা, খাদ্যাভ্যাসে পরিমিতিবোধ এবং চারপাশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আমাদের বড় বড় রোগবালাই থেকে দূরে রাখতে পারে। তাই পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন, সুস্থ থাকুন এবং সুরক্ষিত থেকে বর্ষার প্রতিটি দিন উপভোগ করুন।











