সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর দীর্ঘ পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনো যোগদান করতে পারেননি নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী। নিয়োগ প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ হিসেবে চলমান ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় তাঁদের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ের অসংখ্য বিদ্যালয়ে প্রকট শিক্ষকসংকট বহাল রয়েছে, যা পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানের ওপর প্রভাব ফেলছে।
চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পরপরই প্রার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ডোপ টেস্টসহ প্রয়োজনীয় সনদ যাচাইয়ের কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজও প্রায় শেষ। তবে বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। এই বিশেষ যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলেই কেবল নিয়োগের পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানা গেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী এ বিষয়ে জানান যে, ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াটি এখনো চলমান এবং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ। তিনি বলেন, ‘ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াটি এখনো শেষ হয়নি। এটি একটি চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও প্রতিবেদন পাওয়া গেলেই নিয়োগের পরবর্তী কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে অধিদপ্তর সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।’
দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই সময়ে নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে চরম মানসিক সংকট তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর পাঁচ মাস কেটে গেলেও হাতে পাননি নিয়োগপত্র। দীর্ঘ সময় বেকার থাকার কারণে অনেক প্রার্থী পারিবারিক ও সামাজিকভাবে চাপের মুখে রয়েছেন। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত এক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সবগুলো কঠিন ধাপ পেরিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পরও এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে, তা আমরা কল্পনাও করিনি। আমরা বুঝতে পারছি যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই অত্যন্ত জরুরি। তবে এই প্রক্রিয়াটি যদি দ্রুত শেষ করা যেত, তবে আমাদের মতো হাজারো পরিবারের অনিশ্চয়তা এবং মানসিক যন্ত্রণা অনেকটাই লাঘব হতো।’
প্রার্থীরা আরও জানান, গত মে মাসে শিক্ষামন্ত্রী আটকে থাকা প্রার্থীদের দ্রুত নিয়োগের বিষয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন। তবে সেই আশ্বাসের পরও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় তাঁদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দোহাই দিচ্ছেন যে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রশাসনিক ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে এবং কোনো শিথিলতা রাখা হচ্ছে না। ভেরিফিকেশন শেষ হলেই দ্রুত নিয়োগপত্র প্রদান, পদায়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের কাজ শুরু হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে একটি বিশাল সংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা অনেক কম। নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষক যদি দ্রুত যোগদান করতে পারেন, তবে এই শূন্যতার একটি বড় অংশ পূরণ হবে এবং শিক্ষকসংকট অনেকটাই হ্রাস পাবে।
পাশাপাশি, উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের পর ৩৬ হাজার ২৩৫ জন সহকারী শিক্ষকের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির দীর্ঘদিনের জট খুলেছে। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষক পদোন্নতি পেলে সমসংখ্যক সহকারী শিক্ষকের পদ পুনরায় শূন্য হবে। তখন বর্তমান শূন্য পদের সঙ্গে মিলিয়ে মোট ৩৮ হাজার ৪৩৩ জন নতুন শিক্ষক নিয়োগের বিশাল সুযোগ তৈরি হবে। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হলে এবং পরবর্তী নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হলে মাঠপর্যায়ের এই বিশাল জনবলসংকট মোকাবিলা করা অনেক সহজ হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা যাচাই রাষ্ট্রের একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য দায়িত্ব। তবে এই প্রক্রিয়াটি যেন যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এতে যেমন হাজারো শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা কাটবে, তেমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো প্রয়োজনীয় জনবল পেয়ে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারবে।











