ধর্মতলায় সাংবাদিকদের ওপর নজিরবিহীন হামলা: উত্তাল কলকাতা প্রেসক্লাব, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
কলকাতা: ধর্মতলায় সংবাদকর্মীদের ওপর চালানো নজিরবিহীন ও অমানবিক হামলার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে কলকাতা প্রেসক্লাব। গত ২৪শে জুলাই ছাত্র আন্দোলনের আবহে সংবাদকর্মীদের ওপর যে পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শনিবার (২৫শে জুলাই) বিকেল তিনটায় কলকাতা প্রেসক্লাবের সামনে এক বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা প্রেসক্লাবের সভাপতি স্নেহাশিস সুর, সম্পাদক কিংশুক প্রামানিক এবং নিতাই মালাকার, মৌপ্রিয়া, দিলীপবাবু সহ বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক, চিত্রসাংবাদিক ও তাঁদের সহকর্মীরা। উপস্থিত সকলের কণ্ঠে ছিল একটাই দাবি—সাংবাদিকদের ওপর এই ধরণের হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না এবং দোষীদের দ্রুত শাস্তি দিতে হবে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৪শে জুলাই, যখন ধর্মতলায় প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত দাবিতে বামপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের যুবক ও ছাত্রীদের একটি আন্দোলন চলছিল। অভিযোগ উঠেছে, সেই উত্তাল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তির মদতে আন্দোলনরত সদস্য ও ছাত্ররা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সংবাদকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। হামলাকারীরা কেবল শারীরিক আক্রমণই করেনি, বরং সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নারী সাংবাদিকদের সাথে অত্যন্ত অশালীন আচরণ এবং শারীরিক হেনস্থা করা হয়েছে। এই সহিংসতায় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক গুরুতর আহত হন, যা সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই হামলাটি আকস্মিক কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং গভীর চক্রান্ত করে চালানো হয়েছে।
আহত সাংবাদিকদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি এবং তাঁদের চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছে প্রেসক্লাব। মুখ্যমন্ত্রী নিজে হাসপাতালে গিয়ে আহত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি জানিয়েছেন। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আক্রমণকারীদের চিহ্নিত করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং যারা এই ঘটনার নেপথ্যে থেকে মদত যুগিয়েছেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যমের ওপর এই ধরনের বারবার আক্রমণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাংবাদিকরা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরতে লড়াই করেন, তখন তাঁদের ওপর এ ধরনের পরিকল্পিত হামলা আসলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যে আগামী সোমবার দুপুর আড়াইটায় রাজ্যপালের কাছে একটি ডেপুটেশন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাংবাদিক সমাজ। এই কর্মসূচিতে কেবল কলকাতা নয়, রাজ্যের সমস্ত জেলার সাংবাদিকদের শামিল হওয়ার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি, যারা এই হামলার মদত দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়ে জানানো হয়েছে যে, এই সকল ব্যক্তি ভবিষ্যতে কলকাতা প্রেসক্লাবে প্রবেশ করতে পারবেন না। তাঁদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের সুরক্ষায় এবং ভিড়ের মধ্যে তাঁদের দ্রুত শনাক্তকরণের জন্য বিশেষ জ্যাকেট প্রদানের একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে তাঁরা নিরাপদ থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে যেন তারা তাঁদের কর্মসূচির সময় বিশেষ সতর্ক থাকে। দলের ভেতরে ঢুকে যারা লাঠি, বোমা বা পাথর নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ করে, তাদের প্রতিরোধ করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক কর্তব্য। একইসাথে বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা তাঁদের কর্মীদের নিরাপত্তা ও সম্মানের কথা চিন্তা করেন। সামান্য বেতনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খবর সংগ্রহ করতে ছুটে চলেন, সেই সাংবাদিকদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
সবশেষে, অত্যন্ত অল্প সময়ের নোটিশে যেভাবে সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিকরা এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়েছেন, তার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। দোষীরা যেন দ্রুত আইনের আওতায় আসে এবং সাংবাদিক সমাজ যেন কোনো রকম ভয়ভীতি ছাড়াই নির্ভয়ে কাজ করতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই লড়াই চলবে বলে জানানো হয়েছে।











