জিলাপিকে অধিক মুখরোচক এবং দীর্ঘ সময় মুচমুচে রাখতে বগুড়ার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক 'হাইড্রোজ' ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শহরের ফতেহ আলী বাজারের সামনে, ২ নম্বর রেলঘুনটি এবং বৌবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এই বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত জিলাপি অহরহ বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা চিন্তা করে প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে এসব এলাকায় অভিযান চালিয়েছে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করেছে। তবে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে এই ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার থামছে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শহরের ফতেহ আলী বাজারের সামনে জিলাপি কিনতে আসা ক্রেতা আলামিন হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার পরিবারের সবাই জিলাপি খেতে খুব পছন্দ করে। কিন্তু এখন জানতে পারলাম যে, জিলাপিকে মুচমুচে করতে হাইড্রোজের মতো ভয়ানক কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে। আমরা তো এসব জানতাম না। সাধারণ মানুষ এভাবে প্রতারিত হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের আরও জোরালো নজরদারি এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

তদন্তে দেখা গেছে, অনেক দোকানদার এবং জিলাপি প্রস্তুতকারক কারিগর হাইড্রোজের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন নন। অনেক কারিগরের দাবি, তারা একে সাধারণ খাবারের সোডা মনে করে ব্যবহার করেন। তাদের মতে, এই রাসায়নিক ব্যবহার করলে জিলাপি দীর্ঘক্ষণ মুচমুচে থাকে এবং দেখতে সুন্দর হয়, কিন্তু এটি যে মানবদেহের জন্য বিষাক্ত, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।

এই রাসায়নিকের ভয়াবহতা সম্পর্কে টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন সতর্ক করে জানান, হাইড্রোজ মানবদেহে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং হজম প্রক্রিয়ার মারাত্মক ক্ষতি করে। বিশেষ করে যাদের অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এই রাসায়নিক অত্যন্ত বিপজ্জনক। হাইড্রোজ শরীরে প্রবেশ করলে তা সালফার ডাই-অক্সাইড গ্যাস তৈরি করতে পারে, যা ফুসফুসের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং তীব্র শ্বাসকষ্টের জন্ম দেয়। এছাড়া এটি দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও লিভারের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

বগুড়ার নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. রাসেল জানান, খাদ্যে হাইড্রোজের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই রাসায়নিকটি মূলত টেক্সটাইল, ডাইং ইন্ডাস্ট্রি এবং কাগজ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা জিলাপিকে মচমচে ও আকর্ষণীয় করতে এটি ব্যবহার করছেন। এমনকি সাদা মিষ্টিকে আরও উজ্জ্বল ও সাদা দেখাতেও এই রাসায়নিকের প্রয়োগ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বর্তমানে হাইড্রোজের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে। তাদের কাছে বিশেষ কিছু কেমিক্যাল কিট রয়েছে, যার মাধ্যমে মাত্র ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে জিলাপি বা মিষ্টিতে হাইড্রোজের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব।

মো. রাসেল আরও সতর্ক করে বলেন, হাইড্রোজ মানবদেহের হরমোন তন্ত্রের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। আর হরমোন তন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরের বিপাকক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দেয় এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গণবিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হচ্ছে এবং নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপ-নির্বাহী পরিচালক ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, হাইড্রোজ নিয়মিত শরীরে প্রবেশ করলে পাকস্থলীর জটিলতা, কিডনি ও লিভারের অকার্যকারিতা, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি তৈরি হয়। এটি শরীরকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয় এবং মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করতে পারে।