ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার শোকসন্তপ্ত মা শিরিন আক্তার। তবে ন্যায়বিচার পাওয়ার পর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটলেও, রায় ঘোষণার পর থেকেই পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করে তিনি জরুরি নিরাপত্তা চেয়েছেন। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া এলাকায় নিজ বাড়িতে রায়-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন নুসরাতের মা।
শিরিন আক্তার আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, নুসরাতকে নির্মমভাবে হত্যার পর প্রভাবশালী অনেকে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করে সত্য গোপন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হাইকোর্টের এই রায়ের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হয়েছে যে, এটি কোনো আত্মহত্যা ছিল না, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আদালতের এই সিদ্ধান্তে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট বলে জানান। তবে রায়ের পর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। শিরিন আক্তার অভিযোগ করেন, তাঁদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে সব শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তে তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আকুল আবেদন জানান।
মামলার বিস্তারিত শুনানির পর হাইকোর্ট দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম। একই সঙ্গে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন উম্মে সুলতানা পপি, মোহাম্মদ নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেন জাবেদ ও ইফতেখার হোসেন রানা। অন্যদিকে, প্রমাণের অভাবে ১০ জন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাসপ্রাপ্তরা হলেন মোহাম্মদ শামীম, রুহুল আমিন, আফসার উদ্দিন, মাকসুদ কাউন্সিলর, হাফেজ আব্দুল কাদের, আব্দুর রহিম শরীফ, ইমরান হোসেন মামুন, মহিউদ্দিন শাকিল, কামরুন নাহার মনি এবং আরও একজন আসামি।
সোমবার দুপুরে হাইকোর্ট বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা রায়ের মূল অংশটি পাঠ করে শোনান। প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রায়টি পড়া হয়। রায় ঘোষণার সময় আদালতের এজলাসে অভিযুক্ত আসামি এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মামলার নথিপত্র ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নুসরাতকে তার নিজ কক্ষে ডেকে শ্লীলতাহানি করেন। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় মামলা দায়ের হলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে প্রভাবশালী হয়ে মামলাটি তুলে না নেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে একই বছরের ৬ এপ্রিল নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন, যা পরবর্তীতে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এই মামলার রায় ঘোষণা করে তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। পরবর্তীতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য মামলার নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয় এবং আসামিরা পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও শুনানির পর অবশেষে সোমবার হাইকোর্ট চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।















