দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এখন এক চরম জলবায়ু ঝুঁকির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অঞ্চলে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব যেভাবে বাড়ছে, তাতে সবচেয়ে বেশি সংকটের মুখে রয়েছে ঢাকা। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানানো হয়েছে যে, চরম গরমের কারণে কর্মঘণ্টা হারানোর দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা হবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যদি বর্তমান গতিতে চলতে থাকে, তবে আগামী কয়েক দশকে এই সংকট বহুগুণ বেড়ে গিয়ে শহরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
‘বসবাসযোগ্য ভবিষ্যৎ: দক্ষিণ এশিয়ার শহরে চরম তাপের মধ্যে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি সুরক্ষার উপায়’ শীর্ষক এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কেবল তাপপ্রবাহের কারণেই ঢাকায় যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে, তা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ। এটি ওই সময়ে রাজধানীর মোট বার্ষিক কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশের সমান। এর অর্থ হলো, প্রচণ্ড গরম শুধু সাধারণ মানুষের শারীরিক সক্ষমতা বা কর্মক্ষমতাই কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং এটি সরাসরি শহরের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ২০৫০ সালে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং তা দাঁড়াবে প্রায় ৭ লাখ ৮ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হবে ২০৮০ সালের দিকে; তখন কর্মঘণ্টা হারানোর পরিমাণ বেড়ে হবে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান। সেই সময়ে তাপজনিত কারণে মোট কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা যেকোনো শহরের অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি মেগাসিটির একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নয়াদিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, আহমেদাবাদ, সুরাট ও বারানসি। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ কলকাতায় প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার এবং নয়াদিল্লিতে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই দুই প্রতিবেশী শহরের তুলনায় ঢাকার ক্ষতির পরিমাণ হবে অনেক বেশি, যা প্রমাণ করে যে ঢাকা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তাপপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে অতিরিক্ত গরমের কারণে দেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১৩০ কোটি থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এই অংকটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমান। বিশেষ করে যখন তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে যায়, তখন অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা আরও দ্রুত ও তীব্রভাবে বাড়তে থাকে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় যে ধরনের তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে, তা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র। ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালের প্রায় ৭০ কোটির বেশি মানুষ এমন সব অঞ্চলে বসবাস করেন, যেখানে বছরে অন্তত একদিন বাইরের তাপমাত্রা মানুষের সহনক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে। এছাড়া প্রায় ১২ কোটি মানুষ প্রতিবছর অন্তত এক মাস ধরে চরম তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হন। এর ফলে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের জীবিকা ও কর্মক্ষমতার ওপর গুরুতর প্রভাব পড়ছে।
তবে এই সংকটের মাঝে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ২০১৬ সালে চালু হওয়া ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ শিল্পখাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এর সফল প্রভাবে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে ২৭০টির বেশি কারখানা আন্তর্জাতিক লিড (LEED) সনদ অর্জন করেছে, যা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের এক বড় দৃষ্টান্ত। তবে একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যদি সামগ্রিক পর্যায় থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের পোশাক খাতের রপ্তানিতে সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল ক্ষতি হতে পারে।
তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। উদাহরণ হিসেবে ভারতের আহমেদাবাদের ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, সমন্বিত প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রস্তুতির মাধ্যমে তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ৫০ ডলারের সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়, যা যেকোনো দেশের জন্য অত্যন্ত লাভজনক একটি বিনিয়োগ হতে পারে।
অন্যদিকে, জার্মান গবেষণা ও নীতি পরামর্শ প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবালের পৃথক এক প্রতিবেদনে আরও আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকেরা বছরে গড়ে প্রায় ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবসের সমপরিমাণ কাজ হারাতে পারেন। বর্তমানে এই দুই খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন, কারণ তাঁদের অধিকাংশেরই কোনো স্বাস্থ্যবিমা, বেতনসহ ছুটি কিংবা আয়ের নিরাপত্তা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, চরম তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে এক নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি এবং পারিবারিক আয় কমে যাওয়ার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের এই রূঢ় বাস্তবতায় শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তাপসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং কর্মপরিবেশের আমূল উন্নয়নে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আর কোনো বিকল্প নেই।











