নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী শিল্পাঞ্চলগুলোতে মোট ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। দেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) সিপিডি আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
সিপিডি তাদের পর্যালোচনায় জানায়, এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি এবং সঠিক সময়ে এলএনজি আমদানি করতে না পারার কারণে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। গ্যাসের তীব্র সংকটের ফলে বস্ত্র, স্টিল, কাগজ ও সিরামিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সার উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এই সংকট প্রকট। দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে কেবল ঘোড়াশাল সার কারখানাটি তার সক্ষমতার ৯৬ শতাংশ উৎপাদন করতে পারছে। তবে ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি ব্যবহারের লক্ষ্যে সরকার এখনো কোনো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সংসদ সদস্যদের সরকারি গাড়ি ও প্লট গ্রহণ না করার বিষয়টি প্রশংসনীয়। এছাড়া রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করার উদ্যোগ সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ। নারীদের যাতায়াত নিরাপদ ও সহজ করতে সম্পূর্ণ নারী চালক ও স্টাফ দ্বারা পরিচালিত ‘পিঙ্ক বাস সার্ভিস’ চালু করাকেও তিনি একটি দূরদর্শী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে একইসঙ্গে তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিক নিয়োগের প্রবণতাকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, আইন প্রয়োগে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে মব সহিংসতা এখনো অব্যাহত রয়েছে, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা।
দেশের ঋণের বোঝা প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় জানান, মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ৪৮ হাজার ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৫৫ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, মাথাপিছু ঋণের বোঝা ৭ হাজার ডলার বেড়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তবে কিছু স্বস্তিদায়ক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কম আয়ের ও কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য প্রস্তাবিত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি বিইআরসি প্রত্যাহার করায় নিম্ন আয়ের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। পাশাপাশি কৃষকদের সুদসহ ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার সিদ্ধান্তটি কৃষিখাতের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
সবশেষে শিশু মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে ড. দেবপ্রিয় বলেন, হামে শিশু মৃত্যুর দায় কেবল অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। বরং বর্তমান সরকারের আমলেই এই ধরনের মৃত্যু ঘটছে, যার সঠিক কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিকার প্রয়োজন।















