যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে সোনার আকর্ষণ অমলিন। প্রথাগত হলুদ সোনার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে হোয়াইট গোল্ড বা সাদা সোনা। বিশেষ করে নারীদের সৌন্দর্যচর্চায় এই ধাতুটি কেবল সাজগোজের অনুষঙ্গ নয়, বরং আভিজাত্য ও রুচির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য হয়। অনেক মানুষের কাছে সোনার গয়না কেবল অলঙ্কার নয়, বরং বিপদের বন্ধু এবং এক নিরাপদ অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। আধুনিক ফ্যাশনের ছোঁয়ায় হোয়াইট গোল্ড এখন অনেক নারীর প্রথম পছন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে হোয়াইট গোল্ডের প্রচলন একেবারে নতুন নয়। ১৯ শতকের দিকেও নারীদের অলঙ্কারে এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যেত। বিশেষ করে আংটি, নেকলেস কিংবা দুল তৈরিতে এই সাদা ধাতুর ব্যবহার তৎকালীন ফ্যাশনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। কিন্তু প্রশ্ন জাগতে পারে, এই সাদা সোনা আসলে কী?

প্রযুক্তিগতভাবে হোয়াইট গোল্ড হলো এক ধরনের সংকর ধাতু বা অ্যালয়। খাঁটি সোনা স্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল হলদে রঙের হয়। এই হলুদ রঙকে সাদা বা হালকা রূপ দেওয়ার জন্য ২৪ ক্যারেট খাঁটি সোনার সঙ্গে নিকেল, প্যালাডিয়াম, রূপা বা প্লাটিনামের মতো সাদা রঙের ধাতু মিশ্রিত করা হয়। অর্থাৎ, সাদা সোনা প্রকৃতিতে পাওয়া কোনো একক ধাতু নয়, বরং এটি একটি শিল্পজাত পণ্য। এর উজ্জ্বলতা এবং চকচকে ফিনিশিং নিশ্চিত করতে বাইরের স্তরে সাধারণত 'রোডিয়াম প্লেটিং' করা হয়। রোডিয়ামের এই প্রলেপটি গয়নাকে প্লাটিনামের মতো উজ্জ্বল আভা প্রদান করে এবং ধাতুর উপরিভাগকে স্ক্র্যাচ বা দাগ থেকে রক্ষা করে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, কেন সাদা সোনার দাম হলুদ সোনার চেয়ে বেশি হয়? এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেহেতু সাদা সোনা খনি থেকে সরাসরি পাওয়া যায় না, তাই এটি প্রস্তুত করতে আলাদা এবং জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। এতে ব্যবহৃত প্যালাডিয়াম বা রোডিয়াম অত্যন্ত বিরল এবং মূল্যবান ধাতু, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া রোডিয়াম প্লেটিংয়ের প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুল এবং সময়ের সাথে সাথে এই প্রলেপটি ক্ষয়ে গেলে পুনরায় প্লেটিং করার প্রয়োজন হয়, যা সামগ্রিক খরচ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া হোয়াইট গোল্ডের কারুকাজ ও নকশা তৈরিতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম শৈল্পিকতা এবং বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয়, যা এর বাজারমূল্য বৃদ্ধিতে সহায়ক। উল্লেখ্য যে, ১৮ ক্যারেট সাদা সোনা এবং ১৮ ক্যারেট হলুদ সোনায় সোনার পরিমাণ সমান হলেও, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াকরণ ও রোডিয়াম স্তরের কারণে হোয়াইট গোল্ড সাধারণত বেশি দামি হয়।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এনগেজমেন্ট রিং, বয়ন রিং এবং মূল্যবান রত্ন বসানো গয়নায় হোয়াইট গোল্ডের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে এর উৎপাদন মূলত সেই সব দেশেই বেশি, যেখানে গয়না শিল্প অত্যন্ত শক্তিশালী। ইউরোপের জার্মানি ও ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতে এই ধাতুর প্রস্তুতপ্রণালী অত্যন্ত উন্নত।

হোয়াইট গোল্ডের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৮২৩ সালে ঐতিহাসিক ফরাসি জুয়েলারি বই 'এল’আর্ট দ্যু বিজোউটিয়ার'-এ লুইস-নিকোলাস ভাউকুইলিন সোনা ও প্লাটিনামের মিশ্রণের কথা উল্লেখ করেছিলেন, যাকে সাদা সোনার প্রাথমিক ধারণা হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তীতে ১৯১২ সালে জার্মান রসায়নবিদ কার্ল লুইস উলম্যান সোনা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের মিশ্রণে তৈরি হোয়াইট ধাতুর পেটেন্ট লাভ করেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্লাটিনামের তীব্র অভাব এবং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে এর জনপ্রিয়তা সাময়িকভাবে হ্রাস পায়।

তবে এই আভিজাত্যের আড়ালে কিছু ঝুঁকি ও বিভ্রান্তিও রয়েছে। ১৯ শতকে যখন হোয়াইট গোল্ড জনপ্রিয় হতে শুরু করে, তখন অনেক ক্রেতা প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন। হোয়াইট গোল্ড তৈরিতে একসময় নিকেল ব্যবহৃত হতো, যার ফলে অনেকের ত্বকে অ্যালার্জি, চুলকানি কিংবা ফোলাভাবের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিত। এই স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে ইউরোপের অনেক দেশে বর্তমানে নিকেলযুক্ত হোয়াইট গোল্ডের ব্যবহার সীমিত বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো হোয়াইট গোল্ড এবং প্লাটিনামের মধ্যে রঙের সাদৃশ্য। সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে এই দুটি ধাতুর পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী হোয়াইট গোল্ডকে প্লাটিনাম বলে চালিয়ে দিয়ে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে ক্রেতাদের প্রতারিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই গয়না কেনার ক্ষেত্রে সচেতনতা এবং সঠিক যাচাই-বাছাই অত্যন্ত জরুরি।