বাজারে তীব্র সরবরাহ সংকটের মুখে খোলা চিনির দাম আরও বেড়েছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য দুঃসংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি খোলা চিনির দাম প্রায় ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সর্বশেষ এক সপ্তাহেই এর দাম বেড়েছে আরও ৫ টাকা। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে খোলা চিনি কেজিপ্রতি ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মোড়কজাত বা প্যাকেটজাত চিনির সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি কিনতে পারছেন না।
গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, মোহাম্মাদীয়া হাউজিং লিমিটেড বাজার ও টাউন হল বাজার পরিদর্শনে গিয়ে এবং স্থানীয় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। বিক্রেতাদের দাবি, কোম্পানি, মিলগেট এবং পাইকারি পর্যায়ে চিনির দাম বেড়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। একই সঙ্গে মিলগেট থেকে আগের তুলনায় চিনির সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দেশে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে চিনি উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে উৎপাদন কমে গেছে। ফলে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী চিনি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং এই কৃত্রিম সংকটের সুযোগে দাম বাড়ছে।
রাজধানীর তিনটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক মুদিদোকানেই খোলা চিনির সংকট রয়েছে। তবে তার চেয়েও বেশি সংকট দেখা দিয়েছে মোড়কজাত চিনির ক্ষেত্রে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ১০টি মুদিদোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মাত্র তিনটি দোকানে মোড়কজাত চিনি পাওয়া গেছে। খোলা চিনি পাওয়া গেছে ছয়টি দোকানে। বেশির ভাগ খুচরা দোকানে খোলা চিনি কেজিপ্রতি ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তবে কিছু কিছু দোকানে এর দাম রাখা হয়েছে ১২০ টাকা। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেও এই চিনি বিক্রি হয়েছিল ১১৫ টাকায়, আর তার আগের সপ্তাহে একই পণ্য পাওয়া গিয়েছিল কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায়।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের একজন বিক্রেতা ইমাম পাটোয়ারী জানান, গত দুই সপ্তাহে পাইকারি বাজারে প্রতি ৫০ কেজির বস্তা চিনির দাম প্রায় ৬৫০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে এক বস্তা চিনি কিনতে সাড়ে ৫ হাজার টাকারও বেশি খরচ হচ্ছে, যা খুচরা বাজারে দাম বাড়ানোর প্রধান কারণ। বাজারের কিছু দোকানে মোড়কজাত লাল চিনি পাওয়া গেলেও সেটির দাম সাধারণ চিনির তুলনায় অনেক বেশি; কেজিপ্রতি এই চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়।
বাজারের আরেক বিক্রেতা সাকিব ইমাম বলেন, ‘একজন গ্রাহক প্যাকেট চিনি চেয়েছিলেন, কিন্তু আমার কাছে মজুদ না থাকায় দিতে পারিনি। যেহেতু তিনি আমার নিয়মিত ক্রেতা, তাই আমি পাশের দোকান থেকে ১১৫ টাকায় খোলা চিনি কিনে এনে তাকে দিয়েছি।’
টাউন হল বাজারের এক মুদিদোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে খোলা চিনির দাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোড়কজাত চিনির চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সুযোগে অনেক দোকানদার প্যাকেটজাত চিনি খুলে সেটিকে খোলা চিনি হিসেবে বেশি দামে বিক্রি করছেন। আবার কিছু দোকানে প্যাকেট চিনি মজুদ থাকলেও তা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি না করে ‘নেই’ বলে জানানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
চিনির সরবরাহ হ্রাস এবং লাগামহীন দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার টাউন হল বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে তাজমহল রোডের বাসিন্দা বাহারুল ইসলাম বলেন, ‘একটি প্যাকেট চিনি কেনার জন্য আমি পাঁচটা দোকান ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও পাইনি। শেষ পর্যন্ত এক দোকান থেকে খোলা চিনি কিনতে বাধ্য হলাম, তাও ১৫ টাকা বেশি দামে। কারখানায় উৎপাদন কমলেই কি এভাবে দাম বেড়ে যাবে? এটা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টের।’
ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সরবরাহ সংকট কাটিয়ে বাজারে চিনির স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে সামনের দিনগুলোতে পণ্যটির দাম আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।




















