বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ: জলবায়ু পরিবর্তন ও যুদ্ধের প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাব এবং বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় চরম জটিলতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্যের বাজারে। এর ফলে আগস্ট মাসে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর দেওয়া তথ্যমতে, ২০২২ সালের পর এই মূল্যবৃদ্ধি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আজ শুক্রবার প্রকাশিত খাদ্যপণ্যের দাম সংক্রান্ত বৈশ্বিক পরিস্থিতির এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।

প্রতিবেদনের বরাতে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য সূচকে মাসিক মূল্য পরিবর্তনের গড় আগস্টে দাঁড়িয়েছে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্ট। উল্লেখ্য, জুলাই মাসে এই সূচকটি ছিল সংশোধিত ১৩০ দশমিক ৮ পয়েন্ট। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র দাবদাহ ও খরা, এল নিনোর আশঙ্কা এবং ইউক্রেন ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বাণিজ্যিক অস্থিরতা কৃষিপণ্যের বাজারে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই বহুমুখী সংকটের কারণেই খাদ্যপণ্যের দাম গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগস্টের এই মূল্যবৃদ্ধি ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ।

এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো এক বিবৃতিতে এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "খাদ্যপণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বাজারে পুনরায় ঝুঁকি ফিরে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা ক্রমাগত বাড়ছে।"

আগস্ট মাসের এই মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় রয়েছে খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, চিনি, মাংস এবং দুগ্ধজাত পণ্য। সংস্থাটির মতে, ইউরোপের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ভুট্টা ও বিট থেকে চিনি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং গবাদিপশু পালনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে, এশিয়ায় প্রত্যাশিত এল নিনোর প্রভাবে পাম তেল ও চিনির উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এছাড়া, দীর্ঘ সাড়ে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে শস্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার কারণে সার সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে, যা পরোক্ষভাবে খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।

পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এফএওর খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভোজ্যতেলের সূচক ০ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে গিয়েছে। অন্যদিকে, চিনির মূল্যসূচক ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেকেছে।

পৃথক এক প্রতিবেদনে এফএও আরও জানিয়েছে, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাস নিম্নমুখী। জুলাইয়ের আগের হিসাব থেকে ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন কমিয়ে মোট উৎপাদন ২ দশমিক ৯৮০ বিলিয়ন টন নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি ২০২৫ সালের তুলনায় ২ শতাংশ কম, যা ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ বার্ষিক পতন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।