আমরা প্রায়ই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই যেখানে একই ঘরে কয়েকজন মানুষ বসে থাকলেও দেখা যায়, কেবল একজনকে বারবার মশা কামড়াচ্ছে, অথচ পাশে বসা অন্যরা প্রায় অক্ষত। এই দৃশ্য দেখে অনেকেই রসিকতা করে বলেন, ওই ব্যক্তির রক্ত হয়তো ‘অনেক মিষ্টি’, তাই মশা তাকে বেশি পছন্দ করে। তবে প্রচলিত এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। বিজ্ঞান বলছে, মশার কামড় খাওয়ার বিষয়টি রক্তের মিষ্টতার সঙ্গে মোটেও সম্পর্কিত নয়। বরং মানুষের শরীর থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড, শরীরের তাপমাত্রা, ত্বকের বিশেষ গন্ধ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করে কে মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা মানুষের শরীর থেকে নির্গত বিভিন্ন জৈব সংকেত কয়েক মিটার দূর থেকেই শনাক্ত করতে পারে। এসব সংকেতের কারণেই কেউ মশার কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন, আবার কেউ তুলনামূলকভাবে কম। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কার্বন ডাই-অক্সাইড। মজার ব্যাপার হলো, কেবল স্ত্রী মশারা মানুষের রক্ত পান করে। ডিম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করতেই তারা এই রক্ত পানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১০ মিটার দূর থেকেই মশা মানুষের নিঃশ্বাসে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এই গ্যাসটিই মশার মধ্যে শিকার খোঁজার প্রবণতাকে সক্রিয় করে তোলে। এই কারণেই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ শিশুদের তুলনায় বেশি মশার আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারেন, কারণ তাদের শরীর থেকে তুলনামূলক বেশি পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, একই স্থানে চারজন মানুষ থাকলে কখনও কখনও দেখা যায় যে, ৯০ শতাংশ মশা কেবল একজনের দিকেই আকৃষ্ট হচ্ছে।

নিঃশ্বাসের পাশাপাশি শরীরের তাপমাত্রাও মশার আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা এবং ঘাম মশাকে দ্রুত আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা সাধারণ নারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি মশার লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। এর কারণ হলো, গর্ভাবস্থায় শরীরের বিপাকক্রিয়া বেড়ে যায়, যার ফলে শরীর থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। একইভাবে, ব্যায়াম করার সময় বা ব্যায়ামের পরপরই অনেক মানুষ বেশি মশার কামড়ের শিকার হন। শরীর গরম হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম এবং দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বৃদ্ধি পায়, যা মশার আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া যাদের শারীরিক গঠন তুলনামূলক বড়, তারা বেশি তাপ উৎপন্ন করেন এবং বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করেন, ফলে তাদের প্রতিও মশার আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়।

তবে মশা যখন মানুষের খুব কাছাকাছি চলে আসে, তখন সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে ত্বকের গন্ধ। মানুষের ত্বকে বসবাসকারী অসংখ্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া ঘাম এবং ত্বকের বিভিন্ন উপাদান ভেঙে এমন কিছু রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে, যেগুলো সহজেই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এই যৌগগুলোকে বলা হয় ‘ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ডস’। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ত্বকে এ ধরনের পাঁচ শতাধিক রাসায়নিক যৌগ থাকতে পারে এবং মশা খুব সহজেই এগুলোর পার্থক্য শনাক্ত করতে পারে। বিশেষ করে যাদের ত্বকে কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি, তারা মশার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ৬৪ জনের ত্বকের গন্ধ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তির প্রতি মশার আগ্রহ সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় ব্যক্তির তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি ছিল।

অনেকের বিশ্বাস, রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি হলে মশা বেশি কামড়ায়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মশা রক্তের স্বাদ বুঝে মানুষ নির্বাচন করে না; বরং তারা ত্বকের গন্ধ, নিঃশ্বাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড, শরীরের তাপ এবং রাসায়নিক সংকেত অনুসরণ করেই শিকার বেছে নেয়। এর পাশাপাশি জিনগত কারণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অভিন্ন বা আইডেন্টিক্যাল যমজদের প্রতি মশার আকর্ষণ প্রায় একই রকম হয়, কিন্তু ভিন্ন যমজ বা সাধারণ যমজদের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন হয়। এতে বোঝা যায়, মশার কাছে একজন মানুষ কতটা আকর্ষণীয় হবেন, তার একটি বড় অংশ জিনগতভাবে নির্ধারিত। অর্থাৎ, শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের অনেকটাই বংশগত।

মশার কামড়ের পর সবার শরীরে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। কারও ক্ষেত্রে কেবল ছোট একটি লাল দাগ হয়, আবার কারও ত্বক ফুলে যায়, তীব্র চুলকানি শুরু হয় এবং কয়েক দিন পর্যন্ত অস্বস্তি থাকে। অনেক মানুষ মনে করেন তারা অন্যদের তুলনায় বেশি মশার কামড় খান, কিন্তু বাস্তবে হয়তো কামড়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়; বরং তাদের শরীরের প্রতিক্রিয়া তীব্র হওয়ায় এমন ধারণা তৈরি হয়। গবেষণায় মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জিনের সঙ্গে মশার কামড়ে শরীরের প্রতিক্রিয়ার গভীর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

মশার কামড় এড়াতে বিশেষজ্ঞরা কিছু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী রসুন খাওয়া বা ভিটামিন বি গ্রহণ করলে মশা দূরে থাকে—এমন দাবির পক্ষে কোনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং কার্যকর সুরক্ষার জন্য ডিইইটি (DEET), পিকারিডিন অথবা পিএমডি-সমৃদ্ধ মশা প্রতিরোধক রিপেলেন্ট ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এছাড়া পূর্ণহাতা জামা, লম্বা প্যান্ট এবং কীটনাশকযুক্ত কাপড় ব্যবহার করলে মশার কামড়ের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। তবে মনে রাখতে হবে, ঘাম বা দীর্ঘ সময় ব্যবহারের ফলে রিপেলেন্টের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, তাই প্রয়োজন অনুযায়ী তা পুনরায় ব্যবহার করা জরুরি।

পরিশেষে, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কেউ নিজেকে মশার কাছে কম আকর্ষণীয় মনে করলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কারণ, মশা কাউকেই পুরোপুরি এড়িয়ে চলে না। তাই ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচতে প্রত্যেকেরই যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

সূত্র: বিবিসি