সংবাদ কনটেন্ট ব্যবহারের বিপরীতে যথাযথ অর্থ প্রদান না করলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিশেষ শুল্ক আরোপের কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। দেশটির পার্লামেন্টে সম্প্রতি এই সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল আইন হিসেবে পাস হয়েছে, যা ডিজিটাল সংবাদ পরিবেশন ও বাণিজ্যিক চুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। এই আইনের ফলে মেটা, গুগল, টিকটক এবং লিঙ্কডইনের মতো টেক জায়ান্টদের ওপর সংবাদমাধ্যমের পাওনা পরিশোধের জন্য বড় ধরনের আইনি চাপ তৈরি হয়েছে।
‘নিউজ বার্গেনিং ইনসেনটিভ’ শীর্ষক এই নতুন আইন অনুযায়ী, বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে ন্যায্য বাণিজ্যিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে অস্ট্রেলিয়ায় তাদের অর্জিত বিজ্ঞাপনী আয়ের ওপর আড়াই শতাংশ (২.৫%) বিশেষ শুল্ক ধার্য করা হবে। এই শুল্কের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ সরাসরি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তহবিলে প্রদান করা হবে। মূলত এই সংবাদমাধ্যমগুলোর তৈরি কনটেন্ট ব্যবহার করেই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের ধরে রাখে এবং এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, যার ন্যায্য অংশ স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রাপ্য বলে মনে করছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।
তবে এই নিয়মটি সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। অস্ট্রেলিয়ার বাজারে যাদের শক্তিশালী ব্যবসায়িক উপস্থিতি রয়েছে এবং দেশটিতে যাদের বার্ষিক বিজ্ঞাপনী আয় ২৫ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের বেশি, কেবল তারাই এই আইনি কাঠামোর আওতাভুক্ত হবেন। অন্যদিকে, বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে কৌশলে এই শুল্কের হাত থেকে রেহাই পেতে পারে। এর জন্য শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তাদের অন্তত আটটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বা সংবাদ প্রকাশকের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে। চুক্তির আর্থিক মূল্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের মোট শুল্ক দায়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ ছাড় দেওয়া হবে।
স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোকে বিশেষত ছোট ও মাঝারি মানের প্রকাশকদের টিকিয়ে রাখার জন্য আইনটিতে আকর্ষণীয় কিছু সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যদি বড় কোনো সংবাদ প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তি করে, তবে তারা ১৫০ শতাংশ রেয়াত পাবে। অন্যদিকে, ছোট ও মাঝারি গণমাধ্যমের সঙ্গে চুক্তি করলে সেই রেয়াতের পরিমাণ হবে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে একক কোনো চুক্তির মাধ্যমে মোট শুল্কের ২৫ শতাংশের বেশি রেয়াত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি, যাতে করে সুবিধাটি বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকারের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, এই আইন পাসের মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে বাণিজ্যিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা এবং বাধ্যবাধকতা একদম স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। নিজেদের আর্থিক দায় এড়াতে এবং শুল্কের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে চলতি অর্থবছরের হিসাব শেষ হওয়ার আগেই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় চুক্তি চূড়ান্ত করতে হবে। সরকার এই পদক্ষেপকে অস্ট্রেলীয় সাংবাদিকতা এবং স্থানীয় গণমাধ্যম খাতের সুরক্ষায় একটি ‘ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যের মুখে স্থানীয় গণমাধ্যমের অস্তিত্ব রক্ষা এবং সাংবাদিকতার মান বজায় রাখতেই অস্ট্রেলিয়া সরকার এই সাহসী ও বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করল।




















