বর্তমান আধুনিক বিশ্ব আজ যে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের জালে বন্দী, তার সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত নীরবে। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে, ১৯৯১ সালের ২৩ আগস্ট বিশ্বজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয় 'ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব'। আর এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি রক্ষার্থেই প্রতি বছর এই দিনটিকে 'ইন্টারনেট দিবস' হিসেবে পালন করা হয়।
ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স-লি জেনেভায় অবস্থিত ইউরোপীয় পরমাণু গবেষণা সংস্থা (CERN)-এ কর্মরত থাকাকালীন একটি বিশেষ গবেষণা প্রকল্প তৈরি করেন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ এবং সেগুলো নিয়ে গবেষকদের মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার লক্ষ্যেই এই প্রকল্পের সূচনা। পরবর্তীতে এই উদ্ভাবনটিই 'ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব' (WWW) নামে পরিচিতি লাভ করে। উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালের ১২ মার্চ তিনি প্রথমবারের মতো এই ওয়েবের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। মূলত বার্নার্স-লির এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনের ফলেই জন্ম নেয় ওয়েবসাইট।
অবাক করার বিষয় হলো, বিশ্বের প্রথম ওয়েবসাইটের লিংকটি এখনো সচল রয়েছে। আগ্রহী পাঠকরা (http://info.cern.ch/) এই ঠিকানায় ভিজিট করে ইন্টারনেটের সেই আদি রূপটি দেখতে পারেন। ১৯৯৩ সালে সার্ন এই ওয়েব ব্যবহার সবার জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেয়, যা ইন্টারনেটের গণতন্ত্রীকরণে এক বিশাল ভূমিকা রাখে। এরই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে ওয়েব ব্রাউজার, সার্চ ইঞ্জিন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জয়যাত্রা শুরু হয়।
ওয়েব ব্রাউজারের ইতিহাস শুরু হয়েছিল খোদ টিম বার্নার্স-লির হাত ধরেই। তার তৈরি প্রথম ব্রাউজারটির নাম ছিল 'ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব'। এটি তৎকালীন নেক্সটস্টেপ অপারেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। বর্তমান সময়ের গুগল ক্রোম, অ্যাপলের সাফারি কিংবা মাইক্রোসফটের ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের মতো অত্যাধুনিক বৈশিষ্ট্য তখন এতে ছিল না। যদিও এই ব্রাউজারটি খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি, তবে অনলাইন কার্যক্রমের প্রাথমিক বিকাশে এর প্রভাব ছিল অপরিসীম। ১৯৯৭ সালে এর শেষ সংস্করণটি প্রকাশিত হওয়ার পর এটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে ইন্টারনেটে কোনো কিছু খোঁজার ক্ষেত্রে 'গুগল করা' শব্দবন্ধটি একটি সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে গুগলই বিশ্বের প্রথম সার্চ ইঞ্জিন ছিল না। গুগলের অনেক আগেই, ১৯৯০ সালে কানাডার মন্ট্রিয়ালের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী অ্যালান এমটেজ প্রথম সার্চ ইঞ্জিন 'আর্চি' চালু করেন। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিস্টেম ব্যবস্থাপনার কাজ সহজ করতে তিনি এটি তৈরি করেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথা বললে বর্তমান সময়ে ফেসবুকের নাম সবার আগে মনে পড়ে। তবে এর অনেক আগে, ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে পরিচালিত 'সিক্সডিগ্রিস ডটকম'-কে প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়। সিক্সডিগ্রিসের আগে বিভিন্ন চ্যাট সেবা চালু থাকলেও, এই প্ল্যাটফর্মে প্রথমবারের মতো মানুষ তাদের আসল নাম ব্যবহার করে প্রোফাইল তৈরি, বন্ধুদের তালিকা প্রস্তুত এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্কের আদলে অনলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ পায়। এই পথ ধরেই পরবর্তীতে ফ্রেন্ডস্টার, মাইস্পেস এবং সবশেষে ফেসবুকের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর উত্থান ঘটে।
ইউরো নিউজের তথ্যানুযায়ী, একটি ছোট গবেষণা প্রকল্প থেকে শুরু হয়ে ইন্টারনেট আজ মানবসভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।




















