নরসিংদীর মাধবদীতে এক মর্মান্তিক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে দুই মাস বয়সী এক শিশুকে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তার নিজের চাচির বিরুদ্ধে। পারিবারিক কলহের জেরে শিশুটির পা ভেঙে দেওয়ার এই অভিযোগের পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং অভিযুক্ত পরিবারের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানার আমদিয়া ইউনিয়নের পাইকারদী গ্রামে। জানা গেছে, পারিবারিক বিরোধের কারণে ওই গ্রামের এক শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়। এই ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ভিডিওটি নজরে আসার পরপরই মাধবদী থানা পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে অভিযুক্ত নারী লতা আক্তারসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশি অভিযানে মূল অভিযুক্ত লতা আক্তারের স্বামী কাউসার আহমেদ (৩৩) এবং বাবা আলমাছ মিয়া (৬০)-কে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসা হয়। তবে মূল অভিযুক্ত লতা আক্তার বর্তমানে পলাতক রয়েছেন, যাকে গ্রেফতার করতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামাল হোসেন এই মামলা এবং গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নরসিংদী প্রবেশন অফিসার কার্যালয়ের প্রবেশন অফিসার রিজা আক্তার বাদী হয়ে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে মাধবদী থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। এর আগে গত ১৩ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটিকে নির্যাতনের সেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী অত্যন্ত নির্মমভাবে ছোট এক শিশুর পা মুচড়ে দিচ্ছেন। ভিডিওটি বিভিন্ন ক্যাপশন দিয়ে প্রচার করা হলে দাবি করা হয় যে, শিশুটির পা ভেঙে ফেলা হয়েছে।

ভুক্তভোগী শিশুটি ওই গ্রামের সায়েবা বেগম ও জহিরুল হক জহির দম্পতির সন্তান। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, জন্মের পর থেকেই শিশুটি অসুস্থ থাকায় বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল এবং প্রায়ই উচ্চস্বরে কান্না করত। এই অস্বাভাবিক কান্নার বিষয়ে শিশুর মায়ের সন্দেহ হয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ থাকায় তিনি সন্দেহ করেন যে, শিশুটির সাথে খারাপ কিছু করা হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে তিনি গত ১১ জুলাই বিকেলে ঘরের ভেতর একটি মোবাইল ফোনে গোপনে ভিডিও রেকর্ড চালু রেখে বাইরে চলে যান। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, শিশুটির চাচি লতা আক্তার ঘরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত শিশুর একটি পা জোরে মুচড়ে দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। পরবর্তীতে শিশুটির তীব্র কান্নার শব্দ শুনে মা দৌড়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন এবং ভিডিওতে নির্যাতনের দৃশ্যটি দেখতে পান।

তবে এই পুরো ঘটনায় শিশুটির বাবা জহিরুল হক জহির ভিন্ন কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পারিবারিক কলহের জেরে তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী লতা আক্তার তাদের অগোচরে শিশুটিকে নির্যাতন করতেন। ১১ জুলাই ভিডিওর মাধ্যমে সেই নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও তার সন্তানের পা ভাঙেনি। পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তারা ব্যক্তিগতভাবে মামলা করতে রাজি হননি। তবে পরে জানতে পারেন যে, প্রবেশন অফিসারের মাধ্যমে মামলা করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। মাধবদী থানার ওসি মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ভিডিওটি দেখার পর তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং শিশুটির বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন যে, শিশুটির পা ভাঙেনি, তবে তাকে নিয়মিত নির্যাতন করা হতো। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত তিনজনের মধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পলাতক মূল অভিযুক্ত লতা আক্তারকে দ্রুত গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।