ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় একটি কলেজের ছয় শিক্ষককে ফোন করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হুমকিদাতারা নিজেদের ‘সর্বহারা পার্টির’ সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে শিক্ষকদের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের পক্ষে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বোয়ালমারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেছেন শিক্ষক পরেশ কুমার পাল।
জানা গেছে, ভুক্তভোগী শিক্ষকরা উপজেলার কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের কর্মরত সদস্য। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে তাঁদের ফোনে একের পর এক কল আসতে থাকে। ফোনদাতারা তাঁদের কাছে ১ লাখ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘টোকেন মানি’ হিসেবে দাবি করেন। এই অর্থ প্রদান না করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এই ধারাবাহিক হুমকি ও হুমকির ধরনে শিক্ষকদের মধ্যে চরম অস্থিরতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
জিডির বিবরণ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা ৫৭ মিনিটে কলেজে অবস্থানকালে পরেশ কুমার পালের মুঠোফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনদাতা ব্যক্তিটি নিজেকে ‘গৌতম বিশ্বাস’ হিসেবে পরিচয় দেন এবং দাবি করেন যে, তিনি ‘সর্বহারা পার্টির’ বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য। অভিযোগ অনুযায়ী, ফোনদাতা প্রথমে ১ লাখ টাকা দাবি করলেও পরবর্তীতে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার ৫০০ টাকা ‘টোকেন মানি’ হিসেবে পাঠাতে বলেন। তিনি জানান, সংগঠনের অনেক ‘সহকর্মী’ বর্তমানে কারাগারে বন্দি রয়েছেন এবং তাঁদের মুক্ত করতে জরুরি ভিত্তিতে অর্থের প্রয়োজন। দ্রুত টাকা পাঠাতে চাপ দেওয়া হয় এবং টাকা না দিলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেওয়া হয় বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরেশ কুমার পাল অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানান, সম্প্রতি রংপুরে পরিবারসহ এক শিক্ষক হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার পর তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। একই ধরনের হুমকি ও চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন কলেজের অন্যান্য শিক্ষক নিলয় কুমার সাহা, সজল কান্তি বিশ্বাস, প্রদীপ কুমার সাহা এবং দেবাশীষ রায়। তাঁদের প্রত্যেকের কাছেও একই কায়দায় অর্থ দাবি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অধ্যাপক দেবাশীষ রায় জানান, ফোন করে তাঁর কাছে টাকা দাবি করা হয়। তিনি যখন টাকা দিতে অপারগতা জানান, তখন ফোনদাতা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হুমকি দেন। তিনি বলেন, টাকা না পাঠালে তাঁর ছেলের পায়ে গুলি করে দেওয়া হবে এবং এরপর চিকিৎসার জন্য যেভাবে টাকা সংগ্রহ করতে হয়, সেভাবে পরিচিতজনদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে ‘চরমপন্থা নিতে বাধ্য করবেন না’ বলে তাঁকে সতর্ক করা হয়। শিক্ষক নিলয় কুমার সাহাও জানান, তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে জামিনে সহকর্মীদের ছাড়ানোর জন্য অর্থ চাওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ওই কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রবীন লস্কর। তিনি জানান, দুই দিন আগে তাঁকে ফোন করে চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়া হয়। চরম আতঙ্কে তিনি ফোনদাতাদের দেওয়া একটি বিকাশ নম্বরে ৫ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন।
একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষককে লক্ষ্য করে এই ধারাবাহিক চাঁদাবাজি ও হুমকির ঘটনায় স্থানীয় শিক্ষকমহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হুমকিদাতারা প্রকৃতপক্ষে কোনো চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, নাকি কোনো সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র সংগঠনের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির চেষ্টা করছে—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বর হুমকিদাতারা কীভাবে সংগ্রহ করল, তা নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগকারী পরেশ কুমার পাল বলেন, ‘হুমকির কারণে আমরা ও আমাদের পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যেকোনো সময় হামলা বা প্রাণনাশের ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা করছি।’
এই বিষয়ে জানতে কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগমের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করে বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান শুক্রবার রাতে জানান, পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, কোনো চরমপন্থী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে একটি প্রতারক চক্র এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে হুমকিদাতাদের প্রকৃত পরিচয় এবং এই ঘটনার রহস্য দ্রুত উন্মোচিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।




















