আধুনিক জনস্বাস্থ্যের জন্য বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় হুমকির নাম অসংক্রামক রোগ। হৃদরোগ, ক্যানসার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস কিংবা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের মতো প্রাণঘাতী ব্যাধিগুলো আমাদের সমাজকে এক নীরব মহামারির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর এই ভয়াবহ মহামারির পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে তামাকের অবাধ সহজলভ্যতা। হাতের নাগালে সস্তা তামাকপণ্য এবং জটিল কর কাঠামোর সুযোগ নিয়ে প্রতিনিয়ত বিপুল সংখ্যক মানুষ—বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী—এই মরণফাঁদে জড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অসংক্রামক রোগজনিত অকাল মৃত্যুর একটি বিশাল অংশের জন্য সরাসরি দায়ী তামাকের ব্যবহার।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ (প্রায় ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০২৫-এর তথ্যমতে, তামাকজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, হৃদরোগ, ক্যানসার, স্ট্রোক, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ হলো তামাক। ফলে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো পরিবার, জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এক দীর্ঘমেয়াদি ও অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে অসংক্রামক রোগে (এনসিডি), যার অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। সস্তা দাম ও সহজলভ্যতার কারণে বিপুলসংখ্যক তরুণ ধূমপানে আসক্ত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো রোগের বোঝা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তরুণদের তামাক ব্যবহার থেকে দূরে রাখা এবং আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, "তরুণ বয়সে তামাকের আসক্তি শুরু হলে পরবর্তী জীবনে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই তরুণদের তামাকের মরণফাঁদ থেকে বাঁচাতে আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।"
তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও উদ্বেগজনক। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক বোঝা ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে, একই সময়ে এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, তামাক থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয় তামাকজনিত ক্ষতি মোকাবিলায়। এটি স্পষ্ট করে যে, তামাক খাত থেকে আসা আয় আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লোকসান।
সরকার অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং ক্যানসার ও কিডনি রোগের চিকিৎসা সহজলভ্য করার মতো প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তামাকপণ্যের কর ও মূল্যনীতি যদি কঠোরভাবে কার্যকর না হয়, তবে এসব বিনিয়োগের সুফল সীমিত হয়ে পড়বে। কারণ, একদিকে সরকার অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অর্থ ব্যয় করবে, অন্যদিকে তামাকপণ্য সস্তা ও সহজলভ্য থাকবে—যা সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী পদক্ষেপ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের দামের যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অনেকে। নিম্নস্তরের প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের দাম ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা করা হয়েছে, যা মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি। মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯২ টাকা (১৫ শতাংশ বৃদ্ধি), উচ্চ স্তরের দাম ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা (১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি) এবং প্রিমিয়াম স্তরের দাম ১৮৫ টাকা থেকে ২১০ টাকা (১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি) নির্ধারণ করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই মূল্যবৃদ্ধির হার আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।











