বর্তমান ব্যস্ত সময়ে পেশাগত দায়িত্ব কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে হয়। এর মধ্যে দূরপাল্লার বিমান ভ্রমণ অন্যতম। তবে এই সময়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—বিমান ভ্রমণ কি গর্ভবতী নারী ও তার অনাগত সন্তানের জন্য নিরাপদ? চিকিৎসকদের মতে, মা ও গর্ভস্থ শিশুর কোনো জটিলতা না থাকলে উড়োজাহাজে ভ্রমণ সাধারণত নিরাপদ। গর্ভাবস্থায় বিমান ভ্রমণের ফলে সময়ের আগে প্রসব, পানি ভেঙে যাওয়া কিংবা প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

তবে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সময়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহের পর বিমান ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। আর যদি গর্ভে যমজ সন্তান থাকে, তবে এই সময়সীমা আরও আগে, অর্থাৎ ৩২ সপ্তাহের মধ্যেই শেষ করা উচিত।

উড়োজাহাজের কেবিনে বায়ুচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে, যার প্রভাব যে কারও শরীরেই পড়তে পারে। বাতাসের আর্দ্রতা কম হওয়ার কারণে মুখ ও নাক শুষ্ক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া কানের ভেতরে চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে কান বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা পা ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। সুস্থ ও ঝুঁকিমুক্ত গর্ভবতী নারীদের জন্য এসব প্রতিক্রিয়া সাধারণত বড় কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না, তবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলো জটিল রূপ নিতে পারে।

গর্ভাবস্থায় শরীরের রক্তের ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'হাইপারভিসকোসিটি' বলা হয়। দীর্ঘ বিমান ভ্রমণে (বিশেষ করে চার ঘণ্টার বেশি ভ্রমণে) রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়। এই ঝুঁকি কমাতে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর পা নাড়ানো এবং হাঁটু ভাঁজ করে হালকা ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে পায়ে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে। সুযোগ পেলে কেবিনের ভেতর মাঝে মাঝে হাঁটাহাঁটি করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ ভ্রমণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কম্প্রেশন স্টকিংস ব্যবহার করা যেতে পারে। যাদের ভেনাস থ্রম্বোএমবলিজম, ডিপ ভেইন থ্রম্বসিস কিংবা থ্রম্বোফিলিয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে লো মলিকুলার ওয়েট হেপারিনের মতো রক্ত পাতলাকারক ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন।

কিছু বিশেষ শারীরিক সমস্যায় বিমান ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। যেমন— গুরুতর রক্তস্বল্পতা (যদি হিমোগ্লোবিন প্রতি ডেসিলিটারে ৭.৫ গ্রামের কম হয়), সাম্প্রতিক সময়ে রক্তক্ষরণের ইতিহাস, গুরুতর হৃদ্‌রোগ, সিকল সেল ক্রাইসিস, গুরুতর শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, কানের বা সাইনাসের তীব্র সংক্রমণ, প্লাস্টারসহ ভাঙা পা অথবা অতিরিক্ত পা ফোলা। এ ছাড়া অকালপ্রসবের ঝুঁকি, পানি ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা, গুরুতর প্রি-একলাম্পসিয়া, প্লাসেন্ট প্রিভিয়া থেকে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি, জটিল যমজ গর্ভাবস্থা এবং গর্ভস্থ শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই উড়োজাহাজে ভ্রমণ করা উচিত নয়।