দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ধারণা করা হতো যে, মানবদেহের ক্ষুদ্র এক অঙ্গ থাইমাস গ্রন্থি বয়ঃসন্ধির পর তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করে না। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা, ক্যান্সারের চিকিৎসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সুস্থ বার্ধক্যের সাথে এই গ্রন্থির এক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকতে পারে। যদিও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন যে, বিষয়টি এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং একে দীর্ঘায়ুর একমাত্র নিশ্চিত চাবিকাঠি হিসেবে গণ্য করা premature হবে।
আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বুকের হাড়ের ঠিক পেছনে এবং হৃদ্পিণ্ডের ওপরে অবস্থিত থাইমাস গ্রন্থিটি মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে শিশু বয়সে এই গ্রন্থির সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি থাকে। হাড়ের মজ্জা বা বোন ম্যারো থেকে আসা অপরিণত কোষগুলো থাইমাসে প্রবেশ করে এবং সেখানে পরিপক্ক হয়ে 'টি সেল' (T-cell) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই টি সেলগুলোই মূলত শরীরের প্রধান প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসেবে কাজ করে এবং বিভিন্ন ভাইরাস, ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরকে সুরক্ষা প্রদান করে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ইমিউনিটি অ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্টেশনের অধ্যাপক পাওলা বনফান্তির মতে, শৈশবের পর থেকেই থাইমাস গ্রন্থিটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে শুরু করে এবং এর আকার ছোট হয়ে আসে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই গ্রন্থির কার্যক্ষম কোষগুলোর জায়গা দখল করে নেয় চর্বি এবং বিভিন্ন সংযোজক কলা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রাকৃতিক ক্ষয় প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'ইনভোলিউশন'।
সম্প্রতি সাময়িকী 'নেচার'-এ প্রকাশিত হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একটি গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সহায়তা নেওয়া হয়েছে। সেখানে হাজার হাজার সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যেসব ব্যক্তির থাইমাস গ্রন্থি তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় ছিল, তাদের মধ্যে হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক কম। পাশাপাশি তাদের গড় আয়ুও অন্যদের তুলনায় বেশি হওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া অন্য একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, যাদের থাইমাস সুস্থ ও সক্রিয় থাকে, তাদের ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ইমিউনোথেরাপি অনেক বেশি কার্যকর হয়।
২০২৩ সালের এক গবেষণায় আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকেরা জানান, যাদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে থাইমাস গ্রন্থি অপসারণ করা হয়েছিল, তাদের পরবর্তী পাঁচ বছরে মৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় তিন গুণ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি দুই গুণ বেশি ছিল। এই তথ্যটি থাইমাসের গুরুত্বকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
তবে আশার কথা হলো, থাইমাসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে নিজেকে পুনর্গঠন করার ক্ষমতা রাখে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক প্রতিষ্ঠান 'টলারেন্স বায়ো' বর্তমানে এমন একটি বিশেষ অ্যান্টিবডি নিয়ে কাজ করছে, যা থাইমাসের সংকুচিত হওয়ার বা ইনভোলিউশনের প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সক্ষম হতে পারে। আগামী বছর থেকে এই প্রযুক্তির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বার্ধক্য রোধ বা দীর্ঘায়ু কেবল একটি অঙ্গের ওপর নির্ভর করে না। হাড়ের মজ্জা, লিম্ফ নোডসহ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার আরও অনেকগুলো উপাদানের পরিবর্তনের সাথে এটি সম্পর্কিত। তাই থাইমাসকে এখনই বয়স কমানোর বা দীর্ঘায়ুর চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে গবেষকদের বিশ্বাস, থাইমাস পুনর্গঠনের এই প্রযুক্তি যদি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে ভবিষ্যতে ক্যান্সার এবং জটিল রোগ প্রতিরোধজনিত সমস্যার চিকিৎসায় এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।









