পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে আর সচ্ছলতার স্বপ্ন বুনতে দূর প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন পাঁচ বাংলাদেশি যুবক। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন মরুভূমির তপ্ত রোদে, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জীবনের চাকা ঘোরার আগেই কাতারের সড়কে ঝরে গেল তাদের প্রাণ। সেই পাঁচ রেমিট্যান্স যোদ্ধা অবশেষে দেশে ফিরেছেন, তবে তাঁদের ফেরার পথ ছিল কফিনবন্দি। একই এলাকার পাঁচ সন্তানের এমন মর্মান্তিক ও অকাল মৃত্যুতে কানাইঘাট উপজেলা ছাড়িয়ে পুরো সিলেটজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বজনদের বুক ফাটা আর্তনাদে এবং আহাজারিতে সেখানে উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে (বিজি-২২৬) সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায় প্রবাসী এই পাঁচ বাংলাদেশির মরদেহ। বাংলাদেশ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। নিহতদের পরিচয় পাওয়া গেছে—কানাইঘাট উপজেলার বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ি গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদির আহমদ (৩৩), একই উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নূরের ছেলে জিবাল আহমদ (৩৫), মাঝতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন (৩৮), আগতালুক গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে মস্তাক আহমদ (২৭) এবং একই গ্রামের মড়া মিয়ার ছেলে জুবের আহমদ (২৮)।
সকালে মরদেহগুলো বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর সেখানে এক চরম হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষ করে বাবা জিবাল আহমদের মরদেহের পাশে মুখভার করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর ছোট্ট সন্তান পারভেজ ও নিশা। নিষ্পাপ শিশুদের সেই নীরব শোক আর কফিনের পাশে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে ওঠে এবং জিবালের স্বজনরা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিমানবন্দরের ২ নম্বর গেটে মরদেহ হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেন সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান। এই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ বহনকারী পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত গতিতে কানাইঘাট উপজেলার দিকে ছুটে চলে। মরদেহগুলো যখন নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছায়, তখন সেখানে তৈরি হয় এক করুণ পরিস্থিতি। পরিবারের সদস্য ছাড়াও এলাকাবাসী এই ঘটনায় গভীরভাবে আবেগপ্লুত হয়ে পড়েন। বাবা-মাসহ স্বজনরা তাঁদের সন্তানদের শেষবারের মতো দেখতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। শেষ বিদায় জানাতে বাড়িগুলোতে ভিড় জমান শত শত মানুষ। পরবর্তীতে বাদ জোহর কানাইঘাটের গাছবাড়ি জামিউল উলুম কামিল মাদরাসায় তাঁদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন এবং তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। নামাজ শেষে নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়।
উল্লেখ্য, গত ২১ জুন কাতারের শাহানিয়া এলাকায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় এই পাঁচ বাংলাদেশি প্রবাসী প্রাণ হারান। তাঁরা সবাই কাতারের সানিয়া নামক স্থানে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো ওইদিন বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টার দিকে তাঁরা একটি গাড়িতে করে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। পথে শাহানিয়া এলাকার মহাসড়কে তাঁদের বহনকারী গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে গিয়ে দুমড়েমুচড়ে যায়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশি যাত্রীসহ গাড়ির ভারতীয় চালক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। দুর্ঘটনার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় কাতারে বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের কাউন্সেলর (শ্রম) মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীর সই এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে মরদেহগুলো দেশে পাঠানোর সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে।











