নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্রে উৎসবমুখর ও আবেগঘন পরিবেশে উদযাপিত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। নিউইয়র্কের সেভ দ্য পিপল অডিটোরিয়ামের মঞ্চে এক অনন্য মিলনমেলায় একত্রিত হয়েছিলেন বিভিন্ন প্রজন্মের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা। প্রবাসের মাটিতে থেকেও প্রিয় বিদ্যাপীঠের প্রতি তাঁদের গভীর অনুরাগ এবং শ্রদ্ধা এই আয়োজনকে করে তুলেছিল প্রাণবন্ত। পুরো অনুষ্ঠানের সার্বিক পরিকল্পনা, আয়োজন এবং সঞ্চালনা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
অনুষ্ঠানের সূচনায় অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে যুক্তরাষ্ট্রের ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়, যা উপস্থিত সবার মনে দেশপ্রেম ও সংহতির সুর জাগিয়ে তোলে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ওপর নির্মিত একটি বিশেষ ভিডিও প্রদর্শিত হয়, যা দর্শকদের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ক্যাম্পাসের সেই চিরচেনা আঙিনায়। একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যের একটি বিশেষ ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়, যেখানে তিনি প্রবাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর শুভেচ্ছা ও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে ছিল বিশেষ সম্মাননা প্রদান, স্মৃতিচারণ, মুক্ত আলোচনা, ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা এবং দলীয় আলোকচিত্র ধারণ।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে উপস্থিত সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “শুভ জন্মদিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আজ আমাদের জন্য শুধু স্মৃতিচারণের দিন নয়, বরং বিদ্যাপীঠের জন্য অবদান রাখার দিন।” তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমান শিক্ষার্থী এবং সামগ্রিক সমাজের উন্নয়নে আরও কার্যকর ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারেন। প্রবাসে অবস্থানরত অ্যালামনাইদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন, যাতে একটি সুসংহত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় অবদান রাখা সম্ভব হয়।
ভিডিও বার্তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছে। গবেষণার পরিধি বিস্তৃত করা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ বৃদ্ধি এবং আধুনিক একাডেমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রচেষ্টা নিরন্তরভাবে অব্যাহত রয়েছে। তিনি বিশেষভাবে অনুরোধ জানান যে, দেশে-বিদেশে অবস্থানরত প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা গবেষণা সহায়তা, বিশেষ বৃত্তি প্রদান, মেন্টরশিপ, আন্তর্জাতিক সংযোগ স্থাপন এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল দুই কৃতী প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান। প্রথম সম্মাননা গ্রহণ করেন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ প্রফেসর মহসিন পাটোয়ারী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি এবং কানাডার ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক (CUNY)-এর মেডগার এভার্স কলেজে জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তাঁর একাডেমিক ক্যারিয়ার অত্যন্ত সমৃদ্ধ; তিনি শিক্ষার্থী গবেষণা সহায়তার চারটি বহুমিলিয়ন ডলারের বৃহৎ প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করছেন। দীর্ঘ ৫০ বছরের শিক্ষকতা ও গবেষণা জীবনে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান করেছেন এবং শত শত শিক্ষার্থী ও গবেষকের তত্ত্বাবধান করেছেন। এছাড়া ১৫ বছর তিনি বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ৪৩টি উচ্চমানের গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি একাধিক পাঠ্যপুস্তক ও গ্রন্থের অধ্যায় রচনা করেছেন এবং ৫০ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি গবেষণা ও গবেষণাগার উন্নয়ন অনুদান অর্জন করেছেন। তাঁর এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ফুলব্রাইট সিনিয়র স্পেশালিস্ট অ্যাওয়ার্ড এবং CUNY Salute to the Scholar Award-সহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। সম্মাননা গ্রহণের পর তাঁর বক্তব্যে প্রফেসর পাটোয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে CUNY-তে অধ্যাপক ও প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দীর্ঘ ও অনুপ্রেরণাদায়ক পথচলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে শুধু পুঁথিগত শিক্ষা দেয়নি, বরং নেতৃত্ব প্রদান, আত্মবিশ্বাস এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত শিক্ষা দিয়েছে। তিনি নতুন প্রজন্মকে নিরন্তর গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
দ্বিতীয় সম্মাননা লাভ করেন মোহাম্মদ নাসির সিকদার, যিনি আইবিএম-এর একজন দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, জীবনধারা বিশেষজ্ঞ (লাইফস্টাইল কোচ) এবং ‘Obesity Free World’ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা। ২০০১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা নাসির সিকদার দীর্ঘ সময় ধরে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, জীবনধারা পরিবর্তন এবং স্থূলতা প্রতিরোধে সামাজিক কাজ করে যাচ্ছেন। পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি তিনি একজন আন্তর্জাতিক সহনশীলতা ক্রীড়াবিদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ৩৯টি ম্যারাথন, ১০টি আল্ট্রাম্যারাথন এবং ২০৪টি হাফ ম্যারাথন সম্পন্ন করার বিরল রেকর্ড গড়েছেন। গত ছয় বছরে তিনি ১০ হাজার মাইলেরও বেশি পথ অতিক্রম করে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে এবং এর মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও সবল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
মুক্ত আলোচনা ও স্মৃতিচারণ পর্বে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের ছাত্রজীবনের রঙিন স্মৃতি এবং কর্মজীবনের নানা চ্যালেঞ্জ ও সাফল্যের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। নাসির আলী খান তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে তাঁর নাম সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি বলেন, প্রবাসে থেকেও দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক অটুট রাখা প্রতিটি অ্যালামনাইয়ের নৈতিক দায়িত্ব। মোহাম্মদ হোসেন বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের ঐক্য। আমরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকলেও আমাদের মূল পরিচয় একটাই—আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই ঐক্যই আমাদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি।” আনিসুল কবির জাসির এক অভিনব প্রস্তাব পেশ করেন; তিনি আহ্বান জানান, আগামী বছর থেকে নিউইয়র্কের প্রতিটি বরোভিত্তিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাইদের মিলনমেলার আয়োজন করা হোক, যাতে আরও বেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থী একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান। তিনি এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক করার আহ্বান জানান।
এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত আরও অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী তাঁদের জীবনের সাফল্যের পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদান, ক্যাম্পাসের মুক্ত বাতাস, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সহপাঠীদের সাথে কাটানো সোনালী বন্ধুত্বের কথা আবেগপূর্ণভাবে স্মরণ করেন। তাঁরা একমত হন যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও শক্তিশালী এবং কার্যকর একটি অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
এই মহতী অনুষ্ঠানের আয়োজক কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন স্বপন দাস, জহিরুল হক, মো. ইশতিয়াক উদ্দিন, কাজী জে. ইসলাম, মো. আশরাফুল আলম, দেলোয়ার মানিক, শেখ জিন্নাহ, এম. বদিউজ্জামান, মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির, মোহাম্মদ নাসির সিকদার, দীনা গুলশান, মহসিন পাটোয়ারী, মোহাম্মদ কাদের, মোহাম্মদ এইচ. খান, ইউসুফ আলী, সাইফুল ভূঁইয়া, জাসির কবির, সাজল রোশন, এমডি. পারভেজ সাজ্জাদ, এমএসটি ওয়াহিদা শামসুন, দিলরুবা আয়েশা, শামিন আল আমিন এবং এমডি. আলমাসুর রহমান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা হয় এবং উপস্থিত সকল প্রাক্তন শিক্ষার্থী স্মৃতিবিজড়িত দলীয় আলোকচিত্রে অংশ নেন। প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রবাসে বসবাসরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইরা তাঁদের প্রিয় বিদ্যাপীঠের গৌরবময় ঐতিহ্যকে স্মরণ করেন এবং শিক্ষা, গবেষণা, সমাজসেবা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।











