জাতীয় সংসদে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগের স্বচ্ছতা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং অর্থনৈতিক খাতের সংস্কার নিয়ে এক বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের এক অধিবেশনে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বর্তমান পদক্ষেপসমূহ বর্ণনা করেন।
প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংযোজনের পাশাপাশি বৃহত্তর বগুড়াতে একটি বিশেষায়িত মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা ড্রোন কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় এসব কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরের জন্য ৮৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও আধুনিক যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী একটি বাহিনীতে পরিণত হবে। যা জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, দেশের ভেতরেই একটি সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা বর্তমানে সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলমান। বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এই লক্ষ্যে তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি দুটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
বিনিয়োগ খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে জামালপুর-৩ আসনের বিএনপির এমপি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো প্রকৃত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগের রূপান্তর ও বাস্তবায়ন অগ্রগতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া। বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্রহণ, যাচাই-বাছাই এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, সমন্বিত ও স্বচ্ছ করতে সরকার ‘বাংলাবিজ’ (Banglabiz) প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জটিল ইস্যু নিয়ে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির এমপি সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ স্থাপন ও আলোচনার বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তিনি স্বীকার করেন যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। এর সমাধান অনেকাংশেই নির্ভর করছে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সর্বোপরি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর। রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সরকার এবং আরাকান আর্মির মধ্যে একটি কার্যকর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি হওয়া অপরিহার্য। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপ জোরদার করেছে।
শ্রমবাজার সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল-৬ আসনের এমপি রবিউল আওয়ালের প্রশ্নে সংসদ নেতা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতার কথা বিবেচনা করে সরকার শ্রমবাজারের বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার খোলার পাশাপাশি থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে বাজার সম্প্রসারণের কাজ চলছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ডে কর্মী নিয়োগের চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া পাঠানো হয়েছে।
শেয়ারবাজারের পতন ও অনিয়ম নিয়ে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞ দল, বিনিয়োগকারী সংগঠন এবং তদন্তকারী সংস্থা কাজ করেছে। হাজার হাজার বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করার পেছনে যারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বেশ কিছু ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে মামলাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, শেয়ার বাজারে কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম পুঁজিবাজারের মধ্যকার বৈষম্য দূর করার বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকেও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সবশেষে বিমা খাতের প্রতারণার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ-তে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে।











