ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। বুধবার (৮ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজ নিজ আইডি থেকে দেওয়া পৃথক পোস্টে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি জানান। ইনকিলাব সেন্টারের এই দুই প্রভাবশালী এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ এবং এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। জাবের ও জুমার ফেসবুক পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করলে এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যের কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল জাবের তার ফেসবুক পোস্টে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি শুরুতেই নিজের পরিচয় দিয়ে জানান যে, তিনি ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের প্রতিষ্ঠাকালীন নির্বাহী পরিচালক এবং বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, শহীদ ওসমান হাদি তার শাহাদাতের পূর্বে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের জন্য একটি স্থায়ী ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা সম্পন্ন করার আগেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের আমানত হিসেবে পরিচিত ছিল এবং এর পরিকল্পনাও ছিল জনকল্যাণমুখী, তাই গত ছয় মাস ধরে তারা শহীদ ওসমান হাদির শাহাদাত পরবর্তী ওয়ারিশ সংক্রান্ত জটিলতাগুলো সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। জাবের জানান, সমসাময়িক সময়ে তারা নানাবিধ সৃজনশীল ও প্রোডাক্টিভ কাজের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন এবং সেই কাজগুলো বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে অত্যন্ত দুঃখের সাথে তিনি জানান যে, ইতোমধ্যে বিষয়গুলো আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
জাবের আরও লিখেছেন, আল্লাহ তায়ালা শহীদ ওসমান হাদিকে যে সম্মান দান করেছেন, সেই সম্মানের মর্যাদা রক্ষা করতে এবং তার ওয়ারিশদের দাবির প্রেক্ষিতে যাবতীয় দলিল-দস্তাবেজ যাচাই-বাছাই করে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারটি দাবিকারীদের নিকট হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি তার প্রতি শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, মানুষ তাকে যে ভালোবাসা ও সম্মান দিয়েছেন তার জন্য তিনি আজীবন ঋণী থাকবেন। জনগণের অসম্ভব বিশ্বাসের দায় রক্ষা করতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, তবে তা কতখানি সফল হয়েছে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, শহীদ ওসমান হাদির শাহাদাতের পর ঢাকা ৮ এবং সেন্টারের সকল অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ থাকায় সেই সংক্রান্ত হিসাব প্রদান করা সম্ভব নয়, তবে তার দায়িত্বকালীন সময়ের অন্যান্য সকল হিসাব দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাবলিক করা হবে। ইনসাফের লড়াই এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের যে স্বপ্ন শহীদ ওসমান হাদি জাগিয়েছিলেন, সেই বিশাল ভার বহন করার জন্য তিনি সবার দোয়া কামনা করেন। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারকেন্দ্রিক তার যাত্রার সমাপ্তি টেনে তিনি বলেন, "হাসবি আল্লাহ"।
অন্যদিকে, ফাতিমা তাসনিম জুমা তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন যে, তিনি ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। তিনি জানান, জুলাই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তিনি শুধুমাত্র বাংলাদেশপন্থি সংস্কৃতির স্বার্থে ইনকিলাবে যুক্ত হয়েছিলেন। জুমা উল্লেখ করেন, ইনকিলাব যখন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের চেয়ে রাজনৈতিক দিকে বেশি ঝুঁকে পড়তে শুরু করে, তখন তিনি শহীদ ওসমান হাদির কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন যেন মূল সাংস্কৃতিক ফোকাসটি হারিয়ে না যায়। এরপর তারা সকলে মিলে দিন-রাত এক করে ধীরে ধীরে এই সেন্টারটি গড়ে তুলেছিলেন।
ওসমান হাদির শাহাদাতের পর নানাবিধ ওয়ারিশ সংক্রান্ত ঝামেলা সামনে আসার কথা জানিয়ে জুমা লেখেন, এসব সমস্যা বিবেচনা করে ট্রাস্ট গঠনের চেষ্টা করা হলেও হাদি ভাই তা শেষ করতে পারেননি। শহীদ ওসমান হাদির পর সাধারণ মানুষ তাদের ওপর যে বিশ্বাস রেখেছিল, সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে তারা জনতার আমানত রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে সম্প্রতি ওয়ারিশ সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা প্রকাশ্যে আসার পর নানাবিধ অপপ্রচার ও মানহানিকর মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জুমা আবেগপ্রবণ হয়ে লেখেন, "আমি মনে করি না যে, আমার বাবা-মায়ের টাকায় জীবন অতিবাহিত করার পাশাপাশি এই ধরণের মানসিক বোঝা বহন করার অধিকার আমার আছে। আমার বাবা-মা অন্তত এসব অপমান এবং বিতর্ক দেখার যোগ্য নন।"
জুমা আরও জানান, শহীদ ওসমান হাদির সম্মানের স্বার্থে এবং তার ওয়ারিশদের দাবির মুখে প্রয়োজনীয় দলিল-দস্তাবেজ সাপেক্ষে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারটি দাবিকারীদের নিকট হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভাইয়ের শাহাদাতের পূর্বের সকল অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছিল, তবে তার দায়িত্বকালীন সময়ের সেন্টারের সকল হিসাব দ্রুততম সময়ে প্রকাশ করা হবে। আপনাদের বিশ্বাস ও ভালোবাসার দায় ইনকিলাব মঞ্চ রক্ষা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরিশেষে তিনি বলেন, লড়াইটাই আমাদের কাছে মুখ্য এবং এই লড়াই অন্য কোনো মাধ্যমে বা উপায়ে চলবে। তার মতে, কেবল জিতটাই জীবন নয়, বরং লড়াই করে যাওয়াটাই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।











