বিশ্বজুড়ে বিড়াল এবং মানুষের মধ্যে একটি অত্যন্ত মারাত্মক ছত্রাক সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। নব্বইয়ের দশকে ব্রাজিলে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ছত্রাকটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘স্পোরোথ্রিক্স ব্রাসিলিয়েনসিস’। এটি প্রধানত বিড়ালের শরীরে ক্ষত এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা তৈরি করে এবং পরবর্তীতে বিড়াল থেকে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর দেহে সংক্রামিত হয়। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর এক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কথা জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ড. শন লকহার্ট আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজির এক সভায় এই সংক্রমণকে ‘ভীতিকর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, ব্রাজিলে ইতোমধ্যে এই ছত্রাকের প্রভাবে হাজার হাজার বিড়ালের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ১১ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং প্রায় ২০০টি কুকুর এই মরণঘাতী ছত্রাকের শিকার হয়েছে। বর্তমানে এই সংক্রমণ ব্রাজিল ছাড়িয়ে প্যারাগুয়ে, চিলি, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়েতে ছড়িয়ে পড়েছে। ড. লকহার্ট সতর্ক করে বলেছেন, যদি কোনো পর্যটক দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আক্রান্ত বিড়াল সঙ্গে করে নিয়ে আসেন, তবে খুব দ্রুত এটি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই ছত্রাকটির আক্রমণ ও সংক্রমণের ধরন অত্যন্ত জটিল। এর দুটি ভিন্ন রূপ রয়েছে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় বা মাটিতে এটি এক ধরনের ছাতা বা মোল্ড হিসেবে অবস্থান করে। তবে যখনই এটি কোনো প্রাণী বা মানুষের শরীরের সংস্পর্শে আসে, তখন এটি এককোষী ইস্টে রূপান্তরিত হয়। আক্রান্ত বিড়ালের ত্বক এবং লিম্ফ নোডে গুরুতর ক্ষত তৈরি হয়। সময়মতো চিকিৎসা না করালে এই সংক্রমণ শতভাগ মারাত্মক ও প্রাণঘাতী হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে এটি ত্বকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ক্ষতের সৃষ্টি করে এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে এটি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিড়ালের স্বাভাবিক সামাজিক আচরণই এই সংক্রমণ ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম। বিড়াল যখন একে অপরকে চাটে কিংবা কামড় ও আঁচড় দেয়, তখন এই ছত্রাক খুব সহজেই এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে, আক্রান্ত বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া ২০২২ সালের এক গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে যে, আক্রান্ত বিড়ালের হাঁচির মাধ্যমেও এই ছত্রাক বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই ছত্রাকটি স্টেইনলেস স্টিলের মতো শক্ত তলে প্রায় ১০ সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, যা অন্যান্য সাধারণ ছত্রাকের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পশু চিকিৎসকদের চেম্বার বা টেবিল যথাযথভাবে পরিষ্কার না করা হলে অন্য প্রাণীরাও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তবে আশার কথা হলো, ব্লিচ বা ইথানল ব্যবহার করে এটি সহজেই ধ্বংস করা সম্ভব।

‘সায়েন্স নিউজ’-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে এই ছত্রাক শনাক্তকরণের কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষা প্রচলিত নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিড়াল আমদানির ক্ষেত্রে কেবল সাধারণ সুস্থতার সনদের প্রয়োজন হয়, যার ফলে আক্রান্ত বিড়ালগুলো সহজেই নজর এড়িয়ে দেশে প্রবেশ করতে পারে। এই ঝুঁকি বিবেচনা করে ড. লকহার্ট পশু চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এবং যে কোনো সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে জনস্বাস্থ্য গবেষণাগার বা সিডিসি-কে জানানোর অনুরোধ করেছেন।