বাংলাদেশে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-র এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি ১৩ জন নারীর মধ্যে একজনের মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া ৪৫ বছর বয়সের আগেই সম্পন্ন হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ৪৪টি দেশের নারীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই গবেষণার ফলাফল পাওয়া গেছে, যা মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

গবেষণাটির বিস্তারিত তথ্য গত ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক জার্নাল 'বিএমজে মেডিকেল জার্নালে' (BMJ Medical Journal) প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই গবেষণায় ওই ৪৪টি দেশের ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সি প্রায় ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৮ জন নারীর জাতীয় জনমিতি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার প্রক্রিয়ায় নারীদের মাসিক এবং প্রজনন ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্ন করা হয়েছিল। যাদের টানা ছয় মাস বা তার বেশি সময় মাসিক হয়নি, অথবা যারা জরায়ু অপসারণ বা মেনোপজের কথা জানিয়েছেন, তাদের মেনোপজ হয়েছে বলে গণ্য করা হয়েছে। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মেনোপজের ১২ মাসের সংজ্ঞা ব্যবহার করে পুনরায় বিশ্লেষণ করার পরও ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসেনি, যা গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করে।

সাধারণত মেনোপজ নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক পর্যায়। ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হওয়াকে স্বাভাবিক ধরা হয়। তবে ৪৫ বছর বয়সের আগেই যদি এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তবে তাকে 'আগাম মেনোপজ' এবং ৪০ বছর বয়সের আগে হলে তাকে 'অকাল মেনোপজ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সময়ের আগে এই পরিবর্তন ঘটলে নারীরা প্রত্যাশার অনেক আগেই ইস্ট্রোজেন হরমোনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, হাড় ক্ষয়ের রোগ অস্টিওপরোসিস দেখা দেয় এবং স্মৃতিভ্রংশ ও বিষণ্ণতার মতো গুরুতর মানসিক ও শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

গবেষণার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে অসময়ে মেনোপজ হওয়ার হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সামগ্রিক গড় ৭ দশমিক ১ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপালে এই হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, ভারতে ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে, সময়ের আগে মেনোপজ হওয়া কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট।

গবেষণার প্রধান লেখক ও গবেষক রাইসা বিনতে ইসলাম জানান, অকাল মেনোপজ কেবল জন্মগত বা জৈবিক কারণে ঘটে না। ৪৪টি দেশের তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যারা কম শিক্ষিত, গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন এবং অল্প বয়সে বিয়ে বা সন্তান জন্ম দিয়েছেন, তাদের মধ্যে এই ঝুঁকি অনেক বেশি। তিনি মনে করেন, মেয়েদের শিক্ষার প্রসার এবং মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে প্রজনন স্বাস্থ্যের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।