চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন এবং নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন না করার ফলে দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় এবং বিনা প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি রোধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, এই বিষয়ে তদারকি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন-২ এর সরকারি দলের সদস্য শিরীন সুলতানার বিধি-৭১ এর আওতায় উত্থাপিত একটি জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

আলোচনার শুরুতে শিরীন সুলতানা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের দেশের একটি বড় অংশ চিকিৎসকের সঠিক পরামর্শ না নিয়ে ফার্মেসির বিক্রয়কর্মীর কথায় অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেন। এর পাশাপাশি অধিকাংশ রোগী নির্ধারিত পূর্ণ কোর্স শেষ না করে ওষুধ ছেড়ে দেন, ফলে শরীরের ভেতরের জীবাণু পুরোপুরি ধ্বংস হয় না। এর ফলে তৈরি হয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, যার কারণে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো কার্যকারিতা হারায়। শেষ পর্যন্ত সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিনা প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী, তা জানতে চান তিনি।

সদস্যের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘উত্থাপিত প্রতিটি বিষয়ে দেশে যথাযথ আইন বিদ্যমান রয়েছে এবং সময়ে সময়ে সেই আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকার এই বিষয়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ওষুধ প্রস্তুতকারী আট থেকে দশটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে নকল ওষুধ তৈরির কারখানা শনাক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে। মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

নকল ওষুধ ও অনিয়ম রোধে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নকল ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে দেশের প্রতিটি উপজেলা ও শহরে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল টিম নিয়মিত ওষুধের দোকানে অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানে নকল ওষুধ পাওয়া গেলে কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, আবার কাউকে বড় অংকের জরিমানা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এ ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য দেশে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।’

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো ডিসপেনসারি বা ফার্মেসি যাতে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না করতে পারে, সে বিষয়ে কঠোর আইন রয়েছে। এই পুরো বিষয়টি বর্তমানে চলমান তদারকি এবং মোবাইল কোর্টের নিয়মিত কার্যক্রমের আওতায় রাখা হয়েছে।’

পরিশেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন, জনস্বার্থ রক্ষায় সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এসব অনিয়ম প্রতিরোধে কাজ শুরু করেছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নকল ওষুধ উৎপাদন, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এবং প্রেসক্রিপশনবিহীন অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।