শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলায় এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মধ্যে চরম সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ছুটির আবেদন নাকচ এবং পরকীয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়াকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। গত ২ জুলাই বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে, যার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার পর প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইউএনওর পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনও পাল্টা অভিযোগ জানিয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভেদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়নের আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের মে মাসে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন আলী আসাদ মিয়া। অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ওই বিদ্যালয়ে যোগ দেন। জানা গেছে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা বিষয়ে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের তিক্ত সম্পর্ক ও বিরোধ বিদ্যমান ছিল। এই বিরোধের কারণে এক পর্যায়ে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনকে ছয় মাসের জন্য প্রেষণে পাশের ছুরিরচর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি পুনরায় আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন।
গত ২ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন প্রধান শিক্ষকের কক্ষে প্রবেশ করে ছুটির আবেদন জানান। অভিযোগ উঠেছে, প্রধান শিক্ষক সেই আবেদন মঞ্জুর না করে তাকে বিভিন্ন কটু কথা বলেন, যা থেকে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটির সূত্রপাত হয়। কথা চলাকালীন দেলোয়ার হোসেন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তার স্ত্রীর সাথে হোয়াটসঅ্যাপে অশ্লীল মেসেজ আদান-প্রদান এবং ঢাকায় ভ্রমণের অভিযোগ তোলেন। এই বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে স্কুলের পাশের চা দোকানি জসিম আহমেদ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষকের স্ত্রীর সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার মিমাংসার চেষ্টা করা হলেও প্রধান শিক্ষক পুনরায় ওই নারীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তাকে নিয়ে ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যান বলে অভিযোগ। জসিম আহমেদের দাবি, সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ এবং তার তিনটি সন্তান রয়েছে। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্থানীয়রা সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক ওই নারীর কাছে থাকা কিছু অশ্লীল ছবির ভয় দেখিয়ে তাকে পুনরায় ব্ল্যাকমেইল করেন এবং বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যান। জসিম আহমেদের মতে, এই দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই বৃহস্পতিবারের মারামারির ঘটনাটি ঘটেছে। তিনি ওই প্রধান শিক্ষকের কঠোর বিচার দাবি করেছেন।
তবে এসব গুরুতর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া। তিনি পাল্টা দাবি করেন, সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন নানা অজুহাতে নিয়মিত স্কুল ফাঁকি দিতেন এবং অশালীন আচরণ করতেন। এই অসংলগ্ন আচরণের কারণেই তাকে আগে ছয় মাসের জন্য অন্য স্কুলে প্রেষণে রাখা হয়েছিল। বৃহস্পতিবারের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওইদিন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে শিক্ষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের কথা ছিল। তাই ওই বিশেষ দিনে তাকে ছুটি দেওয়া সম্ভব ছিল না। ছুটি না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে দেলোয়ার হোসেন তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করেন।
পরকীয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে আলী আসাদ মিয়া দাবি করেন, তার ফোনটি চুরি হয়ে গিয়েছিল এবং দেলোয়ার হোসেন সেই সুযোগে ফোন থেকে ছবি ও হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ এডিট করে সাংবাদিকদের দেখিয়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেলোয়ার হোসেন তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে তাকে এই মিথ্যা ঘটনায় জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। ঢাকায় ভ্রমণের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, তিনি একা ঢাকা গিয়েছিলেন এবং সহকারী শিক্ষকের স্ত্রীও একা ঢাকা গিয়েছিলেন; তাদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন তার কষ্টের কথা বর্ণনা করে বলেন, বছর খানেক আগে পারিবারিক সমস্যা মিমাংসার জন্য তিনি প্রধান শিক্ষকের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। সেই সুযোগে প্রধান শিক্ষক তার স্ত্রীর ফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ শুরু করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি স্কুলের সভাপতি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানান। কিন্তু প্রধান শিক্ষক পুনরায় পরকীয়ায় লিপ্ত হলে তিনি তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে তিন সন্তানের কথা চিন্তা করে স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় তিনি তার স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করেন। তবে বিয়ের দুই মাসের মধ্যেই প্রধান শিক্ষক পুনরায় ওই নারীকে অশ্লীল ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করেন এবং তাকে নিয়ে ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে রাত্রিযাপন করেন। দেলোয়ার হোসেনের অভিযোগ, এই লম্পট প্রধান শিক্ষকের কারণেই তার সংসার ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে এবং স্ত্রীর সাথে আবারও বিচ্ছেদ হয়েছে। তিনি জানান, তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য তিনি ছুটি চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রধান শিক্ষক তাকে অপমান করে ছুটি দেননি।
এই পুরো ঘটনায় উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আল মুজাহিদ জানান, দুই শিক্ষকের মধ্যে সংঘাতের বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। প্রধান শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ পেয়ে তিনি সরেজমিনে তদন্ত করেছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুবকর সিদ্দিক বলেন, শিক্ষক মারধরের অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।











