সার্কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি মনে করেন, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) ভেতরে বর্তমানে চরম রাজনৈতিক আস্থার সংকট বিরাজ করছে, যা সংস্থার সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।

বক্তব্যের শুরুতেই প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, সার্ক বর্তমানে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে এর শীর্ষ সম্মেলন প্রক্রিয়া দীর্ঘকাল ধরে থমকে থাকায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সার্ক প্রতিষ্ঠার পেছনে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দূরদর্শী রূপকল্প ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্ম বা অভিন্ন মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা ছিল মূল লক্ষ্য। প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সেই প্রয়োজনীয়তা আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক এবং জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আঞ্চলিক একীকরণ বা সমন্বয়ের যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়নি। দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধগুলো বারবার সার্কের গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে সংস্থাটি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, যিনি সার্কের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং যার মাটিতে এই সংস্থার জন্ম, তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংস্থার স্থবিরতা রোধে এবং এর মূল আদর্শগুলোকে সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশ যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছে কি না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার যথেষ্ট কারণ আমাদের রয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য সম্মিলিত আত্মবিশ্লেষণের একটি বিশেষ মুহূর্ত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গত চার দশক, বিশেষ করে বিগত ১৭ বছরে যদি সদস্য রাষ্ট্রগুলো সার্ককে সত্যিকার অর্থে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করত এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সাথে এর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করত, তবে দক্ষিণ এশিয়া আজ অনেক উন্নত অবস্থানে থাকত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই বছরগুলো কেবল হাতছাড়া হওয়া সুযোগের গল্প হিসেবেই রয়ে গেছে।

তবে আশার কথা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সার্ক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এখনো কার্যকর এবং প্রাসঙ্গিক। সংস্থার সনদ এখনো বহাল রয়েছে এবং এর সচিবালয়সহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থা ও আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর আইনি কাঠামো, প্রযুক্তিগত নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতিভাণ্ডার এখনো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য উন্মুক্ত, যা ভবিষ্যতে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার পথ প্রশস্ত করতে পারে।

সেমিনারটিতে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সাবেক অভিজ্ঞ কূটনীতিক, বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ নীতিনির্ধারণী খাতের পেশাজীবীরা অংশগ্রহণ করেন।