কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার চান্দলা গ্রামে হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে প্রতিবেশীর জমিতে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, আদালতের সুস্পষ্ট এবং কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মামলাভুক্ত জমিতে নতুন ভবন নির্মাণ করে ওই জমির প্রকৃতি ও চরিত্র পরিবর্তনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেন ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়ন যুবদলের সহসভাপতি হান্নান মিয়া, যিনি স্থানীয় প্রয়াত আওয়াল মিয়ার ছেলে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী জরিনা বেগম গত ১০ এপ্রিল ব্রাহ্মণপাড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। একই সঙ্গে তিনি কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছেও বিস্তারিত অভিযোগ জমা দিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। জরিনা বেগমের অভিযোগ অনুযায়ী, জমিটি নিয়ে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তরা জোরপূর্বক নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে।
জমির তফসিল অনুযায়ী, এই বিরোধটি কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার উত্তর চান্দলা মৌজার জে.এল. নং ৯, খতিয়ান নং ১/১, সাবেক দাগ নং ৯৪৮ এবং হাল দাগ নং ৩১৫৯-এর মোট ৪৪ শতক জমি নিয়ে। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মৃত আওয়াল মিয়ার সন্তানেরা খতিয়ানভুক্ত এই সরকারি রেকর্ডকৃত সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছেন। দেওয়ানী মামলা নং-২৯/২০০৩-এর রায়ে আদালত সরকারের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিলেও, ওই রায়ের বিরুদ্ধে তারা হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন মামলা নং-৪১৩০/২০০৮ দায়ের করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হাইকোর্ট রুলের শুনানি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলাভুক্ত সম্পত্তিতে অবস্থিত বাড়ির দেয়াল, ছাদ এবং সীমানাপ্রাচীর সংস্কারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এই অনুমতির সাথে একটি সুস্পষ্ট শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল যে, কোনো অবস্থাতেই নতুন কোনো নির্মাণকাজ করা যাবে না এবং জমির প্রকৃতি ও চরিত্র পরিবর্তন করা যাবে না। একই সঙ্গে উভয় পক্ষকে মামলাভুক্ত সম্পত্তির দখল ও বিদ্যমান অবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু ভুক্তভোগীর দাবি, আদালতের এই নির্দেশনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অভিযুক্তরা বাস্তবে সম্পূর্ণ নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে অভিযুক্তরা মামলাভুক্ত সম্পত্তিতে ভবন নির্মাণ শুরু করেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ব্রাহ্মণপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জকে অবহিত করে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী জরিনা বেগম জানান, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে প্রকাশ্যে নির্মাণকাজ চলতে থাকলেও প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ না থাকায় তিনি ন্যায়বিচারের আশায় কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন, নির্মাণকাজ অবিলম্বে বন্ধ এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত যুবদল নেতা হান্নান মিয়া দাবি করেন, অভিযোগটি সঠিক নয়। তিনি বলেন, "আমরা আমাদের নিজস্ব জায়গায় কাজ করছি। তারা মিথ্যা কথা বলছে।"
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা জাহান জানান, এই জায়গাটি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে এবং আদালত অবমাননার কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, "বিষয়টি নিয়ে এসিল্যান্ডের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি এই বিষয়ে ওসির সঙ্গেও কথা বলব।"
এদিকে, গতকাল রোববার সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে যান কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য হাজী জসিম উদ্দিন। তিনি জানান, বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে সমাধানের জন্য এসিল্যান্ডকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তিনি দ্রুত সরেজমিনে এসে সমস্যাটি সমাধান করবেন।











